লোকসমাচার ডেস্ক: বৃহত্তর কাশ্মিরকে ঘিরে, কেন্দ্রের হঠকারী, অতি উৎসাহী ঝুঁকি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মরিয়া করে তুলবে। এবং মধ্যপন্থী ব্যবসায়ী, ভারতমুখী তারুণ্য আর পাকিস্তান–বিরোধী গঠনশীল রাজনীতির আপসহীন শক্তির সর্বাঙ্গে বেড়ি পরিয়ে দেবে। ন্যাশনাল কনফারেন্স, পিডিপি, কমিউনিস্ট পার্টির মতো যেসব দল এতদিন যে আবেগ, যে যুক্তি, যে দেশপ্রেম নিয়ে জঙ্গিপনা আর তথাকথিত আজাদির লড়াইয়ের মোকাবিলা করছিলে, তাদের দুর্বল, জনবিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ক্ষমতামত্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। তার মানে ভয়ঙ্কর গহ্বর, ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তার ফাঁদে সম্ভবত পা গলিয়ে দিলো অমিত–মোদিশাসিত কৌশল।
বড় বিপদ সামনে। ঝড়ো তাণ্ডব আর বেলাগাম বর্ষণের আভাস চোখ রাঙাচ্ছে। সংবিধানের ৩৭০ ধারা সরাসরি বাতিল করে, জম্মু–কাশ্মীর আর লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের আওতায় ‘বন্দি’ করার সিদ্ধান্তে কেবল কাশ্মীর নয়, পূর্বপ্রান্তের যে সব রাজ্য বিশেষ সাংবিধানিক রক্ষাকবচের আওতাহীন— প্রবল আশঙ্কায় তারাও তটস্থ, বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে। নৈরাজ্যের কাঁটা কিংবা পাথর অন্যত্র তলে তলে কিন্তু কাশ্মিরে প্রকাশ্যে বহুদিন জুড়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এবার ভারতবিরোধী শক্তিও একই বর্গে দাঁড়িয়ে হইহল্লা শুরু করবে। প্ররোচনা আর উসকানির অভাব নেই। একদলীয় আধিপত্যবাদী জেদের রূঢ় মনোভাবের প্রয়োগ ভারতকে সাঙ্ঘাতিক সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে না, এরকম নিশ্চয়তা কোথায়?
স্বাধীনতার পর থেকে পূর্বভারত বহু ঝড়ঝঞ্ঝা, বহু রক্তক্ষয় দেখেছে। কাশ্মির তখন শান্ত ছিল। তার শান্তিকে আশ্বস্ত করেছে সাংবিধানিক আশ্বাস, যার নাম ৩৭০ ও ৩৫–এ। এতে সায় ছিল গান্ধীজি, আম্বেদকর, নেহরু, শেখ আবদুল্লার মতো প্রাজ্ঞ–অভিজ্ঞ নেতাদের।কিন্তু, বিরোধী শিবিরকে হতাশ করে সরকারের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে মায়াবতীর বসপা, অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি, চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলুগু দেশম পার্টি, জগন্মোহন রেড্ডির ওয়াইএসআর এবং চন্দ্রশেখর রাওয়ের টিআরএস। ৩৭০ ধারার বিলোপ এবং রাজ্য পুনর্গঠন বিলের বিরোধিতায় আগাগোড়া সরব থেকেছে কংগ্রেস, সিপিএম, সিপিআই, সপা, ডিএমকে, আইইউএমএল, কেরল মণি কংগ্রেস এবং এমডিএমকে। ওয়াক আউট করেছে তৃণমূল এবং জেডি(ইউ)। ভোটদানে বিরত থেকেছেন এনসিপি–র একমাত্র সাংসদ বন্দনা চৌহান।
গুরুত্বপূর্ণ বিল আনার আগে সর্বদলীয় বৈঠক না ডাকার নিন্দায় সরব থেকেছেন বিরোধীরা। যে পদ্ধতিতে তাড়াহুড়ো করে একসঙ্গে দুটি বিল ও দুটি প্রস্তাব পেশ ও পাশ করানো হয়েছে, তার তীব্র বিরোধিতা করেছে তৃণমূল। তৃণমূলের দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন অভিযোগ করেন, ‘দেশ, গণতন্ত্র, সংসদ এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এসবের তোয়াক্কা করেনি বিজেপি। অসংসদীয় উপায়ে বিল পেশের পর সাংসদদের কপি দেওয়া হয়েছে। ফলে, বিল পড়ে, বুঝে তাতে সংশোধনী প্রস্তাব আনার উপায় পর্যন্ত রাখা হয়নি। সাংসদের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে।’ সরকারের পাশে দাঁড়ানো আঞ্চলিক দলগুলিকে সতর্ক করে ডেরেক বলেন, ‘যে পদ্ধতিতে জম্মু ও কাশ্মীরকে ভেঙে পূ্র্ণ রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নেয়া হলো, অন্য কোনো রাজ্যের সঙ্গে একই ঘটনা ঘটতে পারে।’
ডেরেকের নেতৃত্বে শান্তনু সেন, মানস ভুঁইয়া, দোলা সেন এবং আহমেদ হাসান ইমরানরা ওয়েলে নেমে দীর্ঘক্ষণ স্লোগান দিয়েছেন। ওয়েলে বসে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। অমিত শাহ জবাবি ভাষণ দেয়ার আগে প্রতিবাদ জানিয়ে ওয়াকআউট করেছেন তাঁরা।
বিরোধী দলনেতা গুলাম নবি বলেছেন, জম্মু– কাশ্মিরের তৎকালীন রাজা হরি সিং যে বিশ্বাসে ভারতের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলেন, আজ সেই বিশ্বাস ভঙ্গ করল নরেন্দ্র মোদি সরকার। কেন্দ্রশাসিত জম্মু–কাশ্মির এখন থেকে গুরুত্ব হারাবে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও শিয়া মুসলিমদের মধ্যে অশান্তি আরো বাড়বে। অমিত শাহ তার জবাবি ভাষণে আশ্বাস দিলেন, কয়েক বছর পর জম্মু–কাশ্মিরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়া হবে।
তার কথায়, ‘উপত্যকায় গত ৭০ বছর ধরে ৩টি পরিবারের রাজত্ব চলে এসেছে। এটা বেশিদিন চলতে পারে না। গোটা দেশে এক আইন, এক বিচার ও এক নিয়ম থাকা উচিত। জম্মু–কাশ্মিরে দুর্নীতি, সন্ত্রাসবাদ, বেকারত্ব, শিক্ষায় বাধা, সাম্যতায় বাধা ইত্যাদির মূলে রয়েছে এই ৩৭০ ধারা। তাছাড়া ১৯৪৯ সালে ৩৭০ ধারা চালু করার সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, এটা সাময়িক। কোনো সাময়িক বিষয় ৭০ বছর চলতে পারে না।’
ওদিকে, আপ সাংসদ সুশীলকুমার সিং সরকারের এই পদক্ষেপ সমর্থন করে বলেছেন, ‘এরফলে উপত্যকায় শান্তি ফিরবে। সন্ত্রাসবাদ ধ্বংস হবে।’
কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম বিরোধিতা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘যা হলো তা অসাংবিধানিক। ৩৭০ ধারা তুলে দেয়ার কষ্ট তবু সহ্য করা যায়, কিন্তু, রাজ্য ভেঙে টুকরো করা মস্ত ভুল সিদ্ধান্ত। আজ জম্মু–কাশ্মিরে যা হলো, কাল অন্য রাজ্যেও করা হতে পারে। উত্তরবঙ্গ, তামিলনাড়ু, ওডিশাতেও এই পদ্ধতি নিতে পারে সরকার।’ সূত্র : আজকাল



























