লোকসমাচার ডেস্ক:কাশ্মীর ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক অবনমন (ডাউনগ্রেড) করেছে পাকিস্তান। ভারতের রাষ্ট্রদূতকে ইসলামাবাদ ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ ও দিল্লি থেকে নিজেদের হাইকমিশনারকে ফিরে আসতে বলেছে পাকিস্তান সরকার।
দেশটি ঘোষণা দিয়েছে, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যও আপাতত বন্ধ করে দেবে। এদিকে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছেন বিক্ষুব্ধ জনতা।
কারফিউ উপেক্ষা করে বুধবার জম্মু-কাশ্মীরের জনগণ রাস্তায় নামলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে দুইজন নিহত হন। গত দুই-তিন দিনে রাজনীতিকসহ গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় ৪০০ জনকে।
কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে বুধবার সন্ধ্যায় ইসলামাবাদে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির বৈঠক বসে। সেখানে ভারত কীভাবে কাশ্মীরে অত্যাচার চালাচ্ছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে, সেটা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে তুলে ধরতে সব ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।
বিষয়টি জাতিসংঘের কাছে কীভাবে উত্থাপন করা যায়, তাও খতিয়ে দেখছে পাকিস্তান সরকার। ভারতের সঙ্গে সব দ্বিপাক্ষিক চুক্তি পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেশী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পারভেজ খাট্টাক এবং সেনাপ্রধান ও আইএসআই’র প্রধান বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪৪ ধারা জারি থাকলেও জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা রদের প্রতিবাদে এদিন রাস্তায় নামে অনেক মানুষ। আঞ্চলিক রাজধানী শ্রীনগরে প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয়। নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে অন্তত দু’জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে।
আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন অনেকে। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কেন্দ্রকে পাঠানো রিপোর্টে জানিয়েছিলেন, জম্মু-কাশ্মীরে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রয়েছে। পরদিনই এ তথ্যের বিপরীত চিত্র দেখা যায়।
পুলিশ জানায়, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। এর মধ্যে একজনকে তাড়া করলে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে তার মৃত্যু হয়। তবে গুলিবিদ্ধ হয়ে ওই যুবক নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এএফপি জানিয়েছে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্তত ছয়জনের দেহে গুলির ক্ষত রয়েছে।
এর মধ্যেই শোপিয়ানে স্থানীয়দের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটান ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। এদিন শতাধিক মানুষকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতা রয়েছেন। এদের মধ্যে বড় কোনো নেতা আছেন কিনা, সে বিষয়ে কিছু জানায়নি পুলিশ।
এ নিয়ে বিভিন্ন রাজনীতিক, উপদেষ্টা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাসহ চার শতাধিক মানুষকে গ্রেফতার করা হল। রোববার রাতেই জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক দুই মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতিকে গৃহবন্দি এবং পরদিন তাদের গ্রেফতার করা হয়। এরপর থেকেই একের পর এক নেতা, উপদেষ্টা, রাজনীতিককে গ্রেফতার করা হচ্ছে।
এদিন সাবেক আইএএস অফিসার শাহ ফয়সল কাশ্মীরের সামগ্রিক অবস্থার বর্ণনা দিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তিনি লেখেন, ‘শ্রীনগরে জিরো ব্রিজ থেকে বিমানবন্দর, সব জায়গায় কার্যত কারফিউর চেহারা নিয়েছে। রোগী ও কারফিউ পাসধারী ছাড়া কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না।
জম্মু-কাশ্মীর পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করে নিরাপত্তার ভার তুলে নিয়েছে সেনা সদস্যরা। অন্য জেলাগুলোয় ১৪৪ ধারা আরও কঠোর। রাজ্যের ৮০ লাখ মানুষ এই রকম পরিস্থিতি আগে কখনও দেখেনি।’ তিনি আরও লেখেন, ‘স্যাটেলাইট ফোন ছাড়া টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ। অধিকাংশেরই এখনও স্পষ্ট ধারণা নেই, ঠিক কী হয়েছে। জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের শ্রীনগরের বাইরে যেতে দেয়া হচ্ছে না। বড় কোনো সংঘর্ষের খবর পাওয়া না গেলেও রামবাগ, নতিপোরা, ডাউনটাউন, কুলগাম, অনন্তনাগের মতো জায়গায় বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভ-পাথর ছোড়ার ঘটনার খবর এসেছে।’
ভারতের একাধিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, পুরো কাশ্মীরই যেন কারাগারে পরিণত হয়েছে। সেখানকার বিভিন্ন হোটেল, গেস্ট হাউস, সরকারি ও বেসরকারি ভবনগুলোকে অস্থায়ী কারাগার বানানো হয়েছে।
ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপের গেজেট বুধবার প্রকাশ করেছে দেশটির সরকার। সোম ও মঙ্গলবার ওই ধারা এবং ৩৫-এ ধারা বিলোপ করে রাজ্যসভা ও লোকসভায় বিল পাস হয়। এর আগেই অবশ্য বিলে সই করেন ভারতীয় রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ।
অপরদিকে গেজেট পাসের দিনেই ৩৭০ ধারা বিলুপ্তির মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরের সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল এবং রাজ্য দুটিকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করার যে সিদ্ধান্ত ভারত সরকার নিয়েছে, তা চ্যালেঞ্জ করে দেশটির সুপ্রিমকোর্টে পিটিশন দায়ের করেছেন এমএল শর্মা নামে এক আইনজীবী। বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক উল্লেখ করে জরুরিভিত্তিতে পিটিশনের শুনানির আবেদন করেছেন তিনি।


























