ঢাকা ০৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আহলুস সুন্নাহর দৃষ্টিতে কারবালা ট্রাজেডি

  • আপডেট সময়: ০৪:৩২:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
  • ২৫০ জন দেখেছে
Spread the love

লোকসমাচার ডেস্ক:সুন্নি ইসলামে ইয়াজিদের অবস্থান নিয়ে এক ধরনের ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, ইয়াজিদ সম্ভবত সুন্নিদের কাছে সম্মানিত বা নির্দোষ ব্যক্তি। এটি পুরোপুরি ভুল ধারণা। ইমাম আহমদসহ (রহ.) অন্যান্য সুন্নি অনুসরণীয় আলেমরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম ইয়াজিদকে ভালোবাসতে পারে না।’ কোনো সুন্নি স্কলারের কাছেই ইয়াজিদ পবিত্র বা সম্মানিত কেউ নয়। বিতর্কটা হলো আমরা তাকে কতটা মন্দ বলব বা লানত দেব কি দেব না।

সুন্নি মুসলিমদের কাছে কারবালা ইতিহাসের অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি ট্র্যাজেডি। আজ এমন কোনো মানুষ জীবিত আছেন বলে আমার জানা নেই যিনি কারবালার সেই পাপিষ্ঠ ও নিষ্ঠুর লোকদের প্রতি সহানুভূতিশীল। কারবালার ঘটনাকে কেউ ন্যায়সঙ্গত বলে না। তৎকালীন সেই সেনাবাহিনী বা সরকার—যারাই এর দায়িত্বে ছিল, তাদের পক্ষে কেউই নেই।

কিন্তু, এখানে একটি ‘কিন্তু’ রয়েছে। আমরা এই ঘটনাটিকে ঐতিহাসিক বিপর্যয় বা ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচনা করলেও তা থেকে আমাদের আকীদা বা ধর্মতত্ত্ব আহরণ করি না। এখানেই শিয়াদের সঙ্গে আমাদের মতামতের মূল পার্থক্য। হজরত ওমরের (রা.) হত্যাকাণ্ড ছিল এর চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি। হজরত ওসমানের (রা.) হত্যাকাণ্ড মুসলিম উম্মাহর মধ্যে আরও বড় গৃহযুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল। এগুলো ছিল ঐতিহাসিক বিপর্যয়। এগুলো ঐতিহাসিক ঘটনা হওয়ার কারণে এর বেদনা কোনোভাবেই কমে যায় না। কিন্তু আমরা এগুলো থেকে ধর্মীয় আকীদার মূলনীতি তৈরি করি না। এই ঘটনার কারণে আমাদের কাছে আল্লাহর দ্বীন বদলে যায়নি, কিংবা নতুন কোনো বিধান বা আদেশ আসেনি।

আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, কারবালার ট্র্যাজেডি হলো ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম এক কলঙ্কজনক দাগ। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি অধ্যায়। যদি আমাদের মধ্যে কেউ সেই সময় বেঁচে থাকত, তবে কোনো সন্দেহ ছাড়াই আমরা আহলে বায়তের পক্ষে থাকতাম। কারও মনেই এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়। আমরা জালিম ও স্বৈরাচারীদের বিরুদ্ধে রাসুলুল্লাহ (সা.) দৌহিত্রের সুরক্ষায় নিজেদের জীবন দিয়ে সেখানে লড়াই করতাম। কোনো সুন্নি বা কোনো শিয়ার মনেই এ নিয়ে কোনো সংশয় থাকত না। সুতরাং সেই ট্র্যাজেডির নিষ্ঠুরতা ও ভয়াবহতার বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই।

কিন্তু আবারও বলছি, হজরত হোসাইনের (রা.) জন্মগত নিষ্পাপত্ব বা এ জাতীয় ধারণাগুলোর জায়গায় শিয়াদের সঙ্গে আমাদের দ্বিমত। আমরা বলি যে কারবালার ঘটনা একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি মাত্র। বিপর্যয় এর আগেও ঘটেছে এবং পরেও ঘটেছে, আরও ঘটবে। তবে যেভাবে কারবালার ঘটনাটি ঘটেছিল তা নিঃসন্দেহে বিশেষভাবে বেদনাদায়ক। শিশুদের মৃত্যুর বিষয়টি বিবেচনা করলে এটি হজরত হোসাইনের (রা.) বাবা হজরত আলী (রা.) কিংবা হজরত ওসমানের হত্যাকাণ্ডের চেয়েও ভয়াবহ ও বেদনাদায়ক ট্র্যাজেডি। এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু আমাদের জন্য বিভাজন রেখাটি হলো, ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি ঐতিহাসিকই থাকে। আর এ কারণেই সাধারণ সুন্নিদের হিজরতের পরের প্রথম ৮০ বছরের বা প্রাথমিক ইসলামের ইতিহাস সেভাবে শেখানো হয় না। তারা মূলত সিরাত এবং বড়জোর খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগ পর্যন্ত শেখে। যেহেতু ইতিহাসকে ধর্মতত্ত্ব বা আকীদা হিসেবে দেখা হয় না এবং সুন্নিদের কাছে ইতিহাসের সেই মর্যাদা নেই।

দুর্ভাগ্যবশত কিছু সুন্নি শিয়াদের মহররম পালনের বিরুদ্ধে যাওয়াকে একটি জেদ বানিয়ে ফেলে। নিজেদেরকে শিয়াদের চেয়ে আলাদা প্রমাণ করার জন্য তারা অত্যন্ত অদ্ভুত ও উদ্ভট সব কাণ্ডকারখানা করে যাতে মনে হয় তারা এই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিকে হালকা করে দেখাচ্ছে বা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছে। এমনটা করা একেবারেই উচিত নয়। আমি প্রতি বছরই মহররম মাসে কারবালার ঘটনা আলোচনা করি এবং এ থেকে ঐতিহাসিক শিক্ষাগুলো তুলে ধরি, তবে আমরা একে ইতিহাসের গণ্ডিতেই রাখি।

এ বিষয়ে তো শিয়াদের সঙ্গে আমাদের দ্বিমত নেই যে কারবালায় চরম অন্যায় করা হয়েছিল এবং হোসাইন (রা.) সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, একটি সুন্দর পৃথিবী দেখতে চেয়েছিলেন? এই বিষয়ে তো আমরা সবাই একমত। কিন্তু আল্লাহ কি তাকে কারবালায় যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন? এই জায়গায় আমরা বলি যে, আমরা বেঁচে থাকলে অবশ্যই তাঁর পাশে থাকতাম, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি না যে আল্লাহ তাঁকে এটি করার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন বা তাঁর কাছে ওহি পাঠিয়েছিলেন।

সূত্র: হিদায়া হাব

ট্যাগ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইনফরমেশন সেভ করুন

জনপ্রিয়

দেশে ৮৮ শতাংশ পরিবার আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করছে, শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিতের আহ্বান প্রতিমন্ত্রীর

আহলুস সুন্নাহর দৃষ্টিতে কারবালা ট্রাজেডি

আপডেট সময়: ০৪:৩২:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
Spread the love

লোকসমাচার ডেস্ক:সুন্নি ইসলামে ইয়াজিদের অবস্থান নিয়ে এক ধরনের ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, ইয়াজিদ সম্ভবত সুন্নিদের কাছে সম্মানিত বা নির্দোষ ব্যক্তি। এটি পুরোপুরি ভুল ধারণা। ইমাম আহমদসহ (রহ.) অন্যান্য সুন্নি অনুসরণীয় আলেমরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম ইয়াজিদকে ভালোবাসতে পারে না।’ কোনো সুন্নি স্কলারের কাছেই ইয়াজিদ পবিত্র বা সম্মানিত কেউ নয়। বিতর্কটা হলো আমরা তাকে কতটা মন্দ বলব বা লানত দেব কি দেব না।

সুন্নি মুসলিমদের কাছে কারবালা ইতিহাসের অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি ট্র্যাজেডি। আজ এমন কোনো মানুষ জীবিত আছেন বলে আমার জানা নেই যিনি কারবালার সেই পাপিষ্ঠ ও নিষ্ঠুর লোকদের প্রতি সহানুভূতিশীল। কারবালার ঘটনাকে কেউ ন্যায়সঙ্গত বলে না। তৎকালীন সেই সেনাবাহিনী বা সরকার—যারাই এর দায়িত্বে ছিল, তাদের পক্ষে কেউই নেই।

কিন্তু, এখানে একটি ‘কিন্তু’ রয়েছে। আমরা এই ঘটনাটিকে ঐতিহাসিক বিপর্যয় বা ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচনা করলেও তা থেকে আমাদের আকীদা বা ধর্মতত্ত্ব আহরণ করি না। এখানেই শিয়াদের সঙ্গে আমাদের মতামতের মূল পার্থক্য। হজরত ওমরের (রা.) হত্যাকাণ্ড ছিল এর চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি। হজরত ওসমানের (রা.) হত্যাকাণ্ড মুসলিম উম্মাহর মধ্যে আরও বড় গৃহযুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল। এগুলো ছিল ঐতিহাসিক বিপর্যয়। এগুলো ঐতিহাসিক ঘটনা হওয়ার কারণে এর বেদনা কোনোভাবেই কমে যায় না। কিন্তু আমরা এগুলো থেকে ধর্মীয় আকীদার মূলনীতি তৈরি করি না। এই ঘটনার কারণে আমাদের কাছে আল্লাহর দ্বীন বদলে যায়নি, কিংবা নতুন কোনো বিধান বা আদেশ আসেনি।

আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, কারবালার ট্র্যাজেডি হলো ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম এক কলঙ্কজনক দাগ। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি অধ্যায়। যদি আমাদের মধ্যে কেউ সেই সময় বেঁচে থাকত, তবে কোনো সন্দেহ ছাড়াই আমরা আহলে বায়তের পক্ষে থাকতাম। কারও মনেই এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়। আমরা জালিম ও স্বৈরাচারীদের বিরুদ্ধে রাসুলুল্লাহ (সা.) দৌহিত্রের সুরক্ষায় নিজেদের জীবন দিয়ে সেখানে লড়াই করতাম। কোনো সুন্নি বা কোনো শিয়ার মনেই এ নিয়ে কোনো সংশয় থাকত না। সুতরাং সেই ট্র্যাজেডির নিষ্ঠুরতা ও ভয়াবহতার বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই।

কিন্তু আবারও বলছি, হজরত হোসাইনের (রা.) জন্মগত নিষ্পাপত্ব বা এ জাতীয় ধারণাগুলোর জায়গায় শিয়াদের সঙ্গে আমাদের দ্বিমত। আমরা বলি যে কারবালার ঘটনা একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি মাত্র। বিপর্যয় এর আগেও ঘটেছে এবং পরেও ঘটেছে, আরও ঘটবে। তবে যেভাবে কারবালার ঘটনাটি ঘটেছিল তা নিঃসন্দেহে বিশেষভাবে বেদনাদায়ক। শিশুদের মৃত্যুর বিষয়টি বিবেচনা করলে এটি হজরত হোসাইনের (রা.) বাবা হজরত আলী (রা.) কিংবা হজরত ওসমানের হত্যাকাণ্ডের চেয়েও ভয়াবহ ও বেদনাদায়ক ট্র্যাজেডি। এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু আমাদের জন্য বিভাজন রেখাটি হলো, ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি ঐতিহাসিকই থাকে। আর এ কারণেই সাধারণ সুন্নিদের হিজরতের পরের প্রথম ৮০ বছরের বা প্রাথমিক ইসলামের ইতিহাস সেভাবে শেখানো হয় না। তারা মূলত সিরাত এবং বড়জোর খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগ পর্যন্ত শেখে। যেহেতু ইতিহাসকে ধর্মতত্ত্ব বা আকীদা হিসেবে দেখা হয় না এবং সুন্নিদের কাছে ইতিহাসের সেই মর্যাদা নেই।

দুর্ভাগ্যবশত কিছু সুন্নি শিয়াদের মহররম পালনের বিরুদ্ধে যাওয়াকে একটি জেদ বানিয়ে ফেলে। নিজেদেরকে শিয়াদের চেয়ে আলাদা প্রমাণ করার জন্য তারা অত্যন্ত অদ্ভুত ও উদ্ভট সব কাণ্ডকারখানা করে যাতে মনে হয় তারা এই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিকে হালকা করে দেখাচ্ছে বা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছে। এমনটা করা একেবারেই উচিত নয়। আমি প্রতি বছরই মহররম মাসে কারবালার ঘটনা আলোচনা করি এবং এ থেকে ঐতিহাসিক শিক্ষাগুলো তুলে ধরি, তবে আমরা একে ইতিহাসের গণ্ডিতেই রাখি।

এ বিষয়ে তো শিয়াদের সঙ্গে আমাদের দ্বিমত নেই যে কারবালায় চরম অন্যায় করা হয়েছিল এবং হোসাইন (রা.) সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, একটি সুন্দর পৃথিবী দেখতে চেয়েছিলেন? এই বিষয়ে তো আমরা সবাই একমত। কিন্তু আল্লাহ কি তাকে কারবালায় যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন? এই জায়গায় আমরা বলি যে, আমরা বেঁচে থাকলে অবশ্যই তাঁর পাশে থাকতাম, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি না যে আল্লাহ তাঁকে এটি করার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন বা তাঁর কাছে ওহি পাঠিয়েছিলেন।

সূত্র: হিদায়া হাব