ঢাকা ০৭:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঋণে জর্জরিত হয়ে ২ মেয়েকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন মা

  • আপডেট সময়: ০৬:৫৭:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫ জন দেখেছে
Spread the love

লোকসমাচার ডেস্ক:বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলায় মা ও দুই মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের তদন্তে। চার লাখ টাকার বেশি ঋণ, সংসারের আর্থিক অনটন ও কিস্তি পরিশোধের দুশ্চিন্তা থেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে ইতি রানী বিশ্বাস (৩৪) প্রথমে তার দুই মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাস (১২) ও অনুরাধা বিশ্বাসকে (৩) হত্যা করেন, পরে নিজে আত্মহত্যা করেন বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করছে পুলিশ। যদিও বাদীর দাবি পরিকল্পিত হত্যা।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে বরগুনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মুকিত হাসান খাঁন এসব তথ্য জানান।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৫ বছর আগে বরগুনা পৌরসভার কড়ইতলা নামক এলাকার বাসিন্দা দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে বিয়ে হয় ইতি রানীর। দাম্পত্য জীবনে তাদের দুটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস পেশায় ছোট একটি দর্জির দোকানের পাশাপাশি সুপারির ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন। তবে তার ওই ব্যবসা থেকে সীমিত উপার্জনের টাকায় সংসারের অভাবঅনটন মিটত না। পরে সাংসারিক অবস্থা ও স্বামীর ব্যাবসায় উন্নতির জন্য স্থানীয় পাঁচটি এনজিও থেকে ২ লাখ ২৭ হাজার ৭২৩ টাকা ঋণ নেয় ইতি রানী।

এ ছাড়া স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসও একটি এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং আলাদা দুই ব্যক্তির থেকে আরও ১ লাখ টাকা ধার নেন। এ হিসাব অনুযায়ী স্বামী ও স্ত্রী দুজনের নামে মোট ৪ লাখ ৭ হাজার ৭২৩ টাকা ঋণ নেওয়া হয়।

তবে অধিকাংশ এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি সঠিক সময়ে পরিশোধ করলেও ঋণের সব টাকা পরিশোধ করা নিয়ে মানসিক দুশ্চিন্তায় ভোগেন ভুক্তভোগী ইতি রানী। আর এ কারণেই সাংসারিক উপার্জনে স্বামীর ব্যাবসায় সহায়তার জন্য তিনি জেলা পরিষদের ডাকবাংলায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদে চাকরি নেন। পরবর্তীতে তাদের বিভিন্ন এনজিও থেকে নেওয়া ওই ঋণের দায়ে জর্জরিত থাকায় মানসিক দুশ্চিন্তায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে ইতি রানী আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানায় পুলিশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার দুই মাস আগে ইতি রাণী জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর গত ৩ জুন বেলা ১১টার দিকে দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ডাকবাংলোয় যান। পরে ওইদিন দুপুরের দিকে ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার একটি কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখে অন্য কর্মীরা পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে একটি কক্ষ থেকে বড় মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাস এবং বন্ধ থাকা কক্ষের ভেতর থেকে মা ইতি রাণী ও ছোট মেয়ে অনুরাধা বিশ্বাসের মরদেহ উদ্ধার করে।

তবে একইসঙ্গে মা ও দুই মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি এলাকায় চাঞ্চল্যকর হওয়ায় হত্য নাকি আত্মহত্যা এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনার সৃষ্টি হয়। পরে গত ৯ জুন নিহত ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে বরগুনা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

দায়েরকৃত ওই মামলায় তদন্ত করে ইতি রানী ও তার স্বামী বিভিন্ন এনজিও ও মানুষের কাছে ঋণে জর্জরিত ছিলেন বলে প্রমাণ পায় পুলিশ। আর এ কারণেই মানসিক দুশ্চিন্তায় হতাশাগ্রস্তা হয়ে মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাস ও অনুরাধা বিশ্বাসকে হত্যার পর মা ইতি রানী নিজেই আত্মহত্যা করেন বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে জেলা পুলিশ।

পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মুকিত হাসান খাঁন বলেন, ভুক্তভোগী ইতি রানীর স্বামীর কোনো জমি নেই এবং পুত্রসন্তানও নেই। স্বামীর আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকায়, বিভিন্ন এনজিও থেকে নেওয়া ঋণে জর্জরিত হয়ে মানসিক দুশ্চিন্তায় হতাশাগ্রস্তা হয়ে পড়েন ইতি রানী। আর এ কারণেই তিনি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন আছে। শিগগিরই আদালতে পুলিশ রিপোর্ট দাখিল করা হবে।

ট্যাগ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইনফরমেশন সেভ করুন

জনপ্রিয়

স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অংশ গ্রহনের মাধ্যমে শেষ হলো কিশোর কন্ঠ মেধাবৃত্তি- ২০২৬ পরীক্ষা

ঋণে জর্জরিত হয়ে ২ মেয়েকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন মা

আপডেট সময়: ০৬:৫৭:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
Spread the love

লোকসমাচার ডেস্ক:বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলায় মা ও দুই মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের তদন্তে। চার লাখ টাকার বেশি ঋণ, সংসারের আর্থিক অনটন ও কিস্তি পরিশোধের দুশ্চিন্তা থেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে ইতি রানী বিশ্বাস (৩৪) প্রথমে তার দুই মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাস (১২) ও অনুরাধা বিশ্বাসকে (৩) হত্যা করেন, পরে নিজে আত্মহত্যা করেন বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করছে পুলিশ। যদিও বাদীর দাবি পরিকল্পিত হত্যা।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে বরগুনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মুকিত হাসান খাঁন এসব তথ্য জানান।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৫ বছর আগে বরগুনা পৌরসভার কড়ইতলা নামক এলাকার বাসিন্দা দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে বিয়ে হয় ইতি রানীর। দাম্পত্য জীবনে তাদের দুটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস পেশায় ছোট একটি দর্জির দোকানের পাশাপাশি সুপারির ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন। তবে তার ওই ব্যবসা থেকে সীমিত উপার্জনের টাকায় সংসারের অভাবঅনটন মিটত না। পরে সাংসারিক অবস্থা ও স্বামীর ব্যাবসায় উন্নতির জন্য স্থানীয় পাঁচটি এনজিও থেকে ২ লাখ ২৭ হাজার ৭২৩ টাকা ঋণ নেয় ইতি রানী।

এ ছাড়া স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসও একটি এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং আলাদা দুই ব্যক্তির থেকে আরও ১ লাখ টাকা ধার নেন। এ হিসাব অনুযায়ী স্বামী ও স্ত্রী দুজনের নামে মোট ৪ লাখ ৭ হাজার ৭২৩ টাকা ঋণ নেওয়া হয়।

তবে অধিকাংশ এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি সঠিক সময়ে পরিশোধ করলেও ঋণের সব টাকা পরিশোধ করা নিয়ে মানসিক দুশ্চিন্তায় ভোগেন ভুক্তভোগী ইতি রানী। আর এ কারণেই সাংসারিক উপার্জনে স্বামীর ব্যাবসায় সহায়তার জন্য তিনি জেলা পরিষদের ডাকবাংলায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদে চাকরি নেন। পরবর্তীতে তাদের বিভিন্ন এনজিও থেকে নেওয়া ওই ঋণের দায়ে জর্জরিত থাকায় মানসিক দুশ্চিন্তায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে ইতি রানী আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানায় পুলিশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার দুই মাস আগে ইতি রাণী জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর গত ৩ জুন বেলা ১১টার দিকে দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ডাকবাংলোয় যান। পরে ওইদিন দুপুরের দিকে ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার একটি কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখে অন্য কর্মীরা পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে একটি কক্ষ থেকে বড় মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাস এবং বন্ধ থাকা কক্ষের ভেতর থেকে মা ইতি রাণী ও ছোট মেয়ে অনুরাধা বিশ্বাসের মরদেহ উদ্ধার করে।

তবে একইসঙ্গে মা ও দুই মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি এলাকায় চাঞ্চল্যকর হওয়ায় হত্য নাকি আত্মহত্যা এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনার সৃষ্টি হয়। পরে গত ৯ জুন নিহত ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে বরগুনা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

দায়েরকৃত ওই মামলায় তদন্ত করে ইতি রানী ও তার স্বামী বিভিন্ন এনজিও ও মানুষের কাছে ঋণে জর্জরিত ছিলেন বলে প্রমাণ পায় পুলিশ। আর এ কারণেই মানসিক দুশ্চিন্তায় হতাশাগ্রস্তা হয়ে মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাস ও অনুরাধা বিশ্বাসকে হত্যার পর মা ইতি রানী নিজেই আত্মহত্যা করেন বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে জেলা পুলিশ।

পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মুকিত হাসান খাঁন বলেন, ভুক্তভোগী ইতি রানীর স্বামীর কোনো জমি নেই এবং পুত্রসন্তানও নেই। স্বামীর আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকায়, বিভিন্ন এনজিও থেকে নেওয়া ঋণে জর্জরিত হয়ে মানসিক দুশ্চিন্তায় হতাশাগ্রস্তা হয়ে পড়েন ইতি রানী। আর এ কারণেই তিনি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন আছে। শিগগিরই আদালতে পুলিশ রিপোর্ট দাখিল করা হবে।