লোকসমাচার অনুসন্ধান প্রতিবেদন:যশোর শহরের ঘোপ জেল রোডের প্রায় ছয় শতক জমি নিয়ে জাল দলিল, ভুয়া ডিসিআর, প্রতারণা ও সরকারি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে যশোর সদর সাব-রেজিস্ট্রারসহ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে। মামলায় ওই ছয় শতক জমির দলিলমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ঘোপ জেল রোডের বাসিন্দা ফজলে আকবরের ছেলে ফজলে রাব্বী যশোরের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলাটি করেন। আদালত অভিযোগটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্দেশ দিয়েছেন।
যেভাবে শুরু বিরোধ
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ফজলে আকবর ২০১৯ সালের ২০ অক্টোবর যশোর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১৪২৯৯ নম্বর দলিলের মাধ্যমে বিভিন্ন দাগসহ মোট ৮২ দশমিক ৪৫ শতক জমি রেজিস্ট্রি করেন। পরবর্তীতে জমিটি ফজলে রাব্বীর নামে নামজারি করা হয় এবং তিনি নিয়মিত খাজনা দিয়ে আসছিলেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই জমির ছয় শতক নিয়ে ফজলে রাব্বীর পরিবারের সাবেক কেয়ারটেকার মোশারফ হোসেন ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর ১৪২৭৪ নম্বরের একটি কবলা দলিল তৈরি করেন এবং পরে সেটির ভিত্তিতে নামজারির উদ্যোগ নেন। বিষয়টি নিয়ে দেওয়ানি আদালতে মামলা হলে ২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট বিরোধপূর্ণ জমিতে উচ্ছেদ, মাটি কাটা, স্থাপনা নির্মাণ, হস্তান্তর কিংবা জমির প্রকৃতি পরিবর্তনের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই আপিল আদালতও সেই আদেশ বহাল রাখেন।
নিষেধাজ্ঞার পরও কীভাবে দলিল?
মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ এখানেই।
বাদীপক্ষের দাবি, আদালতের নিষেধাজ্ঞা এবং নামজারি কার্যক্রম স্থগিত থাকার পরও কথিতভাবে একটি ভুয়া ডিসিআর তৈরি ও ব্যবহার করে জমিটি হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট যশোর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১০৫৬৩/২০২৫ নম্বর সাফ-কবলা দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়। ওই দলিলে ছয় শতক জমির বিক্রয়মূল্য ৩ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে।
বাদীর দাবি, ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই করা হয়েছে বলে উল্লেখ থাকা ডিসিআরের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। ওই কথিত ভুয়া ডিসিআর ব্যবহার করে দলিল রেজিস্ট্রি এবং জমির প্রকৃত মূল্যের তুলনায় কম মূল্য দেখিয়ে সরকারি রাজস্ব ও ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগও মামলায় আনা হয়েছে।
মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে
মামলায় যশোর সদর সাব-রেজিস্ট্রার আমেনা বেগম, মোশারফ হোসেন, ফজলিয়ারা খাতুন, দলিলের সাক্ষী ফকরুল কবির বুলবুল, মহসিন, জামাল হোসেন, দলিল শনাক্তকারী ওমর ফারুক সাগর এবং দলিল লেখক কাজী রুহুল কুদ্দুসকে আসামি করা হয়েছে।
লোকসমাচারের অনুসন্ধানে যে প্রশ্নগুলো সামনে
ঘটনাটিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—
প্রথমত, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা অবস্থায় বিরোধপূর্ণ জমির হস্তান্তর কীভাবে সম্ভব হলো?
দ্বিতীয়ত, মামলায় যে ডিসিআরকে ভুয়া বলা হচ্ছে, সেটি আসলে কোন উৎস থেকে তৈরি বা ব্যবহৃত হয়েছে?
তৃতীয়ত, ৬ শতক জমির দলিলে ৩ কোটি টাকা মূল্য দেখানো হলেও বাদীপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী সরকারি রাজস্ব ও ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি কীভাবে ঘটল?
চতুর্থত, দলিল তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাক্ষী, শনাক্তকারী, দলিল লেখক এবং রেজিস্ট্রি প্রক্রিয়ায় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল?
পঞ্চমত, পূর্বের আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও নামজারি স্থগিতের তথ্য সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রি প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না—এটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এসব প্রশ্নের উত্তর কাগজপত্র যাচাই ও তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসতে পারে।
এখন নজর দুদকের তদন্তে
আদালত অভিযোগটি তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য দুদককে নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে এখন মূল বিষয় হলো—অভিযোগে উল্লেখ করা দলিল, ডিসিআর, নামজারি রেকর্ড, আদালতের নিষেধাজ্ঞার আদেশ এবং রেজিস্ট্রি-সংক্রান্ত নথি যাচাই করে তদন্তে কী তথ্য বেরিয়ে আসে। এ পর্যায়ে মামলায় ওঠা অভিযোগগুলো প্রমাণিত নয়; আদালতের নির্দেশে তদন্তের পরই অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে। সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের বক্তব্যও তদন্তের অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
লোকসমাচারের অনুসন্ধান:
ছয় শতক জমি, আদালতের নিষেধাজ্ঞা, কথিত ভুয়া ডিসিআর এবং ৩ কোটি টাকার দলিল—এই চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন। নথিপত্রের সত্যতা যাচাই হলে বোঝা যাবে, এটি নিছক জমি নিয়ে বিরোধ, নাকি এর সঙ্গে দলিল জালিয়াতি ও সরকারি রাজস্বসংক্রান্ত অনিয়মের কোনো প্রমাণ রয়েছে।

























