লোকসমাচার,নিজস্ব প্রতিবেদক:যশোরে কথিত পাওনা টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে একের পর এক ঘটনার অভিযোগ ঘিরে জটিলতা তৈরি হয়েছে। একজন ব্যবসায়ীকে দোকান থেকে ধরে নিয়ে আটকে রাখা, দোকানে তালা দেওয়া, পুলিশের হস্তক্ষেপে চাবি উদ্ধার, পাওনার অঙ্ক ২২ লাখ থেকে ১৪ লাখে নামা, জামিনদার হিসেবে চেক ও স্ট্যাম্প দেওয়া এবং পরবর্তীতে ওই জামিনদারের কাছেই টাকা দাবি—এমন একাধিক ঘটনা উঠে এসেছে যশোরের পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে।
এ ঘটনায় মোঃ আলী জিন্নাহ নামে এক ব্যক্তি পুলিশের কাছে আইনগত সহায়তা ও নিরপেক্ষ তদন্তের আবেদন করেছেন। তাঁর আবেদনে বড় বাজারের মাছ ব্যবসায়ী কামাল ফারাজি ও তাঁর ছেলে শাকিব ফারাজিকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্যও তদন্তের অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
শুরুটা ২২ লাখ টাকার দাবি থেকে
পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া আবেদনের বর্ণনা অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে আলী জিন্নাহ তাঁর খালাতো ছোট বোনের কাছ থেকে জানতে পারেন, তাঁর বোনের স্বামী আরএন রোডের পার্টস ব্যবসায়ী বিল্লালকে পাওনাদার কামাল ফারাজি ও তাঁর ছেলেরা দোকান থেকে ধরে নিয়ে আটকে রেখেছেন এবং টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত ছাড়বেন না বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বিষয়টি জানার পর আলী জিন্নাহ কামাল ফারাজির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাঁর মাছের আড়তে গিয়ে বিল্লালের সঙ্গে কথা বলেন বলে আবেদনে উল্লেখ করেছেন। সেখানে কামাল ফারাজি বিল্লালের কাছে ২২ লাখ টাকা পাওনা দাবি করেন এবং টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করার কথা বলেন—এমন দাবি করা হয়েছে আবেদনে। আলী জিন্নাহর বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি তখন বিল্লালকে ছাড়িয়ে আনার উদ্যোগ নেন এবং পরবর্তীতে দুই পক্ষের মধ্যে হিসাব-নিকাশ করে বিষয়টি সমাধানের কথা বলা হয়।
দোকানে তালা, পুলিশের হস্তক্ষেপ
এর দুই দিন পর বিল্লাল তাঁকে ফোন করে জানান, কামাল ফারাজির ছেলে তাঁর দুটি দোকানে তালা দিয়ে চাবি নিয়ে গেছেন—এমন অভিযোগও আবেদনে রয়েছে। বিল্লালের বক্তব্য ছিল, দোকান বন্ধ থাকলে ব্যবসা চালানো সম্ভব নয় এবং ব্যবসা না করতে পারলে পাওনা টাকা পরিশোধও করা সম্ভব হবে না।
পরিস্থিতিতে আলী জিন্নাহ বিল্লালকে দিয়ে কোতোয়ালি মডেল থানায় অভিযোগ করান বলে নথিতে উল্লেখ আছে। আবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ রাতে বন্ধ দোকান পরিদর্শন করে এবং বিবাদী পক্ষের কাছ থেকে চাবি উদ্ধার করে বিল্লালের কাছে ফেরত দেয়। একই সঙ্গে পরবর্তী আলোচনার জন্য ১৪ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে সংশ্লিষ্টদের থানায় উপস্থিত হতে বলা হয়।
থানায় আলোচনায় বদলে যায় পাওনার হিসাব
ঘটনার এই অংশটিই পুরো বিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। আবেদনকারীর বর্ণনা অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর ২০২৫ থানায় পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে আলোচনার সময় প্রথমে যে ২২ লাখ টাকা পাওনার কথা বলা হয়েছিল, সেই হিসাব সঠিক নয় বলে প্রতীয়মান হয়।
নথিতে বলা হয়েছে, আলোচনায় মূল টাকা ছিল প্রায় ১২ লাখ টাকা এবং এর সঙ্গে ১০ লাখ টাকা সুদের হিসাব যোগ করা হয়েছিল। পরে উভয় পক্ষের সম্মতিতে পাওনার হিসাব ১৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয় বলে আবেদনকারী দাবি করেছেন।
এখানেই অনুসন্ধানের বড় প্রশ্ন—
২২ লাখ টাকার দাবি কীভাবে ১৪ লাখ টাকায় নেমে এলো? ১২ লাখ মূল টাকার সঙ্গে ১০ লাখ সুদের হিসাব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল?
১৪ লাখ টাকার সমঝোতার লিখিত কোনো দলিল ছিল কি না? পুলিশের উপস্থিতিতে ওই আলোচনা বা সমঝোতার কোনো রেকর্ড রয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বিরোধের আর্থিক ভিত্তি অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে। জামিনদার হলেন আলী জিন্নাহ, দেওয়া হলো চেক ও স্ট্যাম্প
নথির বর্ণনা অনুযায়ী, আলোচনার একপর্যায়ে বলা হয়—আলী জিন্নাহ যদি বিল্লালের পক্ষ থেকে জামিনদার হন, তাহলে ১৪ লাখ টাকার বিষয়ে সময় দেওয়া হবে।
বিল্লাল নাকি দুই মাস সময় চেয়েছিলেন এবং ওই সময়ের মধ্যে বাড়ি বিক্রি করে টাকা পরিশোধের কথা বলেছিলেন। এরপর আলী জিন্নাহ জামিনদার হতে রাজি হন এবং তাঁর কাছ থেকে চেক ও স্ট্যাম্প নেওয়া হয় বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
বিল্লাল উধাও, দায় এসে পড়ে জামিনদারের ওপর?
আবেদনকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, এক মাসের মধ্যে বিল্লাল তাঁর পরিবার নিয়ে চলে যান। পরে তাঁদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়। অন্য একটি আবেদনে আলী জিন্নাহ উল্লেখ করেছেন, বিল্লালকে খুঁজে বের করার কাজে তাঁকে বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়েছে এবং এতে তাঁর প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—
যার কাছ থেকে মূল পাওনা আদায়ের কথা, তিনি যদি অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে তাঁর জামিনদারের কাছ থেকে টাকা আদায়ের আইনগত ভিত্তি কী ছিল?
এটি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট চেক, স্ট্যাম্প, জামিননামা এবং অন্যান্য কাগজপত্র পরীক্ষা করে আইনগতভাবে নির্ধারণের বিষয়।
৮ জানুয়ারি ২০২৬: পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ
পরবর্তী পর্যায়ে ৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে আলী জিন্নাহ যশোরের পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ করেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় তৎকালীন যশোর উপশহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ অলোক বাবুকে।
আবেদনকারীর দাবি, তদন্তের সময় অলোক বাবু কামাল ফারাজিকে জানিয়ে দেন—ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ড বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে না এবং প্রয়োজন হলে আইনগতভাবে বিষয়টির সমাধান করতে হবে। এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য এবং তদন্ত-সংক্রান্ত নথি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
‘এই টাকার জন্য আপনি মার্ডার হয়ে যাবেন’—চাঞ্চল্যকর অভিযোগ
পরবর্তী সময়ে ঘটনাটি আরও গুরুতর মোড় নেয় বলে অভিযোগ করেছেন আলী জিন্নাহ। তাঁর আবেদনে বলা হয়েছে, কামাল ফারাজি তাঁর কাছে টাকা পাওনা দাবি করে অন্য একজনের মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করেন। এরপর ওই ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করলে তাঁকে বলা হয়—
“এই টাকার জন্য আপনি মার্ডার হয়ে যাবেন।”
এটি সত্য হলে বিষয়টি নিছক আর্থিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং নিরাপত্তা ও ফৌজদারি তদন্তের প্রশ্নও সামনে আসে। তবে এই বক্তব্য কে বলেছেন, তাঁর পরিচয় কী, কোথায় ও কখন কথাটি বলা হয়েছে, সেখানে আর কেউ উপস্থিত ছিলেন কি না এবং কোনো অডিও/কল রেকর্ড বা প্রত্যক্ষদর্শী আছে কি না—এসব যাচাই করা জরুরি।
একই ঘটনায় কেন এতগুলো পরস্পর-সম্পর্কিত দাবি?
নথিগুলো বিশ্লেষণ করলে ঘটনাপ্রবাহে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে নজরে আসে—
প্রথমত, শুরুতে ২২ লাখ টাকা পাওনার দাবি করা হয়েছিল বলে আবেদনকারী জানিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, থানায় আলোচনার সময় সেই হিসাব পরিবর্তিত হয়ে ১৪ লাখ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
তৃতীয়ত, ১৪ লাখ টাকার দায়ের ক্ষেত্রে আলী জিন্নাহকে জামিনদার করা হয় এবং তাঁর চেক ও স্ট্যাম্প নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চতুর্থত, মূল দেনাদার বিল্লাল ও তাঁর পরিবারের অনুপস্থিতির পর জামিনদার আলী জিন্নাহর ওপর টাকা পরিশোধের চাপ তৈরি হয় বলে তাঁর অভিযোগ।
পঞ্চমত, পরবর্তী সময়ে এই অর্থনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে তাঁকে হয়রানি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এই ধারাবাহিকতার প্রতিটি ধাপের আলাদা আলাদা প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
অনুসন্ধানের কেন্দ্রে এখন যে প্রশ্নগুলো
ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হলে অন্তত নিম্নোক্ত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন—
১. বিল্লালকে ধরে নিয়ে আটকে রাখার অভিযোগ সত্য কি না।
২. দোকানে তালা দেওয়ার ঘটনা কে বা কারা ঘটিয়েছিল এবং পুলিশ কীভাবে চাবি উদ্ধার করেছিল।
৩. ২২ লাখ টাকা পাওনার দাবির পক্ষে কী কী কাগজপত্র ছিল।
৪. পরবর্তীতে ১২ লাখ মূল টাকা ও ১০ লাখ সুদের হিসাবের ভিত্তি কী।
৫. ১৪ লাখ টাকার সমঝোতা কীভাবে হলো এবং তার লিখিত প্রমাণ আছে কি না।
৬. আলী জিন্নাহ কী শর্তে জামিনদার হয়েছিলেন এবং তাঁর চেক ও স্ট্যাম্প কী উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল।
৭. বিল্লাল কোথায় গেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না।
৮. আলী জিন্নাহকে ১৪ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়ার আইনগত ভিত্তি কী ছিল।
৯. “এই টাকার জন্য আপনি মার্ডার হয়ে যাবেন”—এই বক্তব্যের সত্যতা কী।
১০. পুলিশি তদন্তের সময় কোনো লিখিত প্রতিবেদন, জিডি, অভিযোগ, সাক্ষ্য বা অন্যান্য নথি তৈরি হয়েছিল কি না।
অভিযোগের বিপরীতে অভিযুক্তদের বক্তব্যও জরুরি
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার—উল্লিখিত ঘটনাগুলো আলী জিন্নাহর লিখিত আবেদনে করা অভিযোগ ও বর্ণনার ভিত্তিতে উঠে এসেছে। এগুলোকে আদালত বা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কামাল ফারাজি ও তাঁর ছেলে শাকিব ফারাজির বক্তব্য, বিল্লালের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য, চেক-স্ট্যাম্প ও আর্থিক লেনদেনের নথি এবং থানার সংশ্লিষ্ট রেকর্ড পাওয়া গেলে অনুসন্ধানটি আরও শক্তিশালী হবে।
একটি আর্থিক বিরোধ কীভাবে ২২ লাখ টাকার দাবি থেকে ১৪ লাখ টাকার সমঝোতা, জামিনদার হিসেবে চেক-স্ট্যাম্প, দেনাদারের অনুপস্থিতি, পুলিশের হস্তক্ষেপ এবং পরবর্তীতে হুমকির অভিযোগে গড়াল—নথিগুলো সেই ধারাবাহিকতারই ইঙ্গিত দেয়।
তাই বিষয়টি ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে আর্থিক লেনদেনের নথি, থানার রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং কথিত হুমকির প্রমাণ যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন।
এই ঘটনায় প্রকৃত পাওনা কত ছিল, কার কাছে কত টাকা পাওনা ছিল এবং শেষ পর্যন্ত কেন একজন জামিনদারের ওপর আর্থিক ও অন্যান্য চাপ তৈরি হলো—এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন অনুসন্ধানের মূল বিষয়।

























