লোকসমাচার ঢাকা অফিস,জাফরান আকন্দ:রাসুলুল্লাহ সা.-এর আদর্শ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালার আলোকে বাংলাদেশে ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট আলেম, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও চিন্তাবিদগণ।
তারা বলেছেন, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সফলতা শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না। নাগরিকের মৌলিক অধিকার, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, সুশাসন, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সাম্য, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করাই একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবন ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালায় এসব বিষয়ের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি স্টাডিস (ঈচঝ) উদ্যোগে আয়োজিত ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শে বাংলাদেশে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর আফতাবনগরস্থ কুরআন সেন্টারে এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সেন্টার ফর পলিসি স্টাডিসের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুস শহীদ নাসিম। উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন করেন সেন্টার ফর পলিসি স্টাডিস (ঈচঝ) নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান।
অন্যতম আলোচক প্রফেসর ড. চৌধুরি মাহমুদ হাসান বলেন, রাসূল সা. নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে থেকেই আদর্শিক মানুষ ছিলেন, তিনি আদর্শিক মানুষ ছিলেন কিন্তু ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠায় কুরআনের নির্দেশনাই ছিল মূল পাথেয়। তিনি আরও বলেন, ইসলামে যে পারিবারিক বন্ধন রয়েছে তা উন্নত বিশ্বে নেই বললেই চলে। তাই অমুসলিমরাও ইসলামের এ সৌন্দর্যকে ভালোবাসে। মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. আব্দুর রব বলেন, রাসূল সা. প্রথম কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেই রাষ্ট্রের আলোকে পরবর্তী খোলাফায়ে রাশিদিনের যুগ, উমর ইবনু আব্দুল আজিজের শাসনামলের শাসনব্যস্থায় কল্যাণ রাষ্ট্রের সফলতার কথা উল্লেখ করেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. নকিব মুহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারার মধ্য দিয়ে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে মানুষের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণের মাধ্যমে তিনি একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। মদিনার রাষ্ট্রব্যবস্থায় পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক সংহতি, ন্যায়বিচার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের যে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল, তা বর্তমান বিশ্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার উৎস হতে পারে।
বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রশাসনের সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্য দূর করে যোগ্যতা ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বণ্টন করতে হবে। জনগণের অধিকার রক্ষায় আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থাকে কার্যকর ও সহজলভ্য করতে হবে।
তাদের মতে, কল্যাণ রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো সমাজের পিছিয়ে পড়া ও অসহায় মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ করা। দরিদ্র, এতিম, বিধবা, প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ও কর্মক্ষমতা হারানো মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা বলেন, দেশের সম্পদ ও অর্থনৈতিক সুযোগের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে।
বক্তারা বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে আমানত হিসেবে গ্রহণ করা। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জনগণের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ক্ষমতা ও পদকে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনগণের অধিকার রক্ষায় দায়িত্বশীলদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
বৈঠকে আরও বলা হয়, একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকেও নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। নাগরিকদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, সততা, মানবিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা আবদুস শহীদ নাসিম বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে ন্যায় ও জনকল্যাণ। তিনি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, দুর্বলদের সুরক্ষা, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই বাংলাদেশে একটি কার্যকর কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর আদর্শ থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ুকল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি নৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও বৈষম্য দূর করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই কল্যাণ রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্তিশালী হতে পারে।” তিনি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নানান দিক তুলে ধরে বলেন, কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন কুরআনকে জানা, বোঝা, মানা ও অনুসরণ করা। শুধু থিওরি দিয়ে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এজন্য দরকার মসজিদ ভিত্তিক কুরআন বোঝার কার্যক্রম পরিচালনা করা।
মাওলানা আবদুস শহীদ নাসিম আরও বলেন, বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা, সংবিধান, সামাজিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের মৌলিক নীতিগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত কল্যাণ রাষ্ট্রের রূপরেখা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে গবেষণা, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে হলে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে নারীদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন ও দুর্নীতিমুক্ত বিতরণব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা মনে করেন, বাংলাদেশে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব ও সামাজিক অবক্ষয় বড় চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা প্রয়োজন। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাষ্ট্রীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে আরও বলা হয়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের আলোকে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও নীতিগত আলোচনা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি করা সম্ভব।
গোলটেবিল বৈঠকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তি, আলেম, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সমাজচিন্তক ও নীতিবিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন। তারা বাংলাদেশে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা, প্রয়োজনীয় সংস্কার, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত মতামত ও সুপারিশ তুলে ধরেন।
বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, ন্যায়, মানবিকতা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণের নীতিকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে স্থান দিতে পারলে বাংলাদেশ একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যেতে পারবে। গোল টেবিল বৈঠকে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পিএসসি সাবেক মেম্বর মিসেস ওএনএম সিদ্দিকা খানম, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. সামসুল আলম, ব্রি. জে. আবদুল হাকিম আজিজ (অব.), প্রফেসর তহুর আহমদ হেলালী ও এডভোকেট মশিউল আলম।






















