লোকসমাচার ডেস্ক:প্রধানমন্ত্রীর প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠক থেকেই ঠিক ছিল—সরকারের প্রথম ছয় মাসের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে মন্ত্রিসভায় বড় রদবদল আসতে পারে। সেই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘ছয় মাস পর মূল্যায়ন হবে।’ গত ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখন পারফরম্যান্স মূল্যায়নের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, মূল্যায়নের ভিত্তিতে অন্তত তিনজন পূর্ণ মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রীকে বাদ দেওয়ার তালিকা প্রস্তুত করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
যে কারণে বাদ পড়ছেন মন্ত্রীরা
বাদ পড়তে যাওয়া মন্ত্রীদের তালিকায় সবার আগে আছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন। দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা আয়োজন এবং সাম্প্রতিক কয়েকটি বক্তব্যের কারণে তাকে নিয়ে সরকারের উচ্চমহলে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। সূত্র জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ হিসেবে তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত।
তালিকায় দ্বিতীয় পূর্ণ মন্ত্রী স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। বিভিন্ন বক্তব্য ও ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত। আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশন সম্পর্কে তার একটি মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি নিজেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যেই তাকে মূল বিষয়ে থাকার পরামর্শ দেন, যা নিয়ে বেশ আলোচনা হয়।
এছাড়াও বিভিন্ন তদবির ও দুর্নীতির আলোচনা রয়েছে আরও এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর বিরুদ্ধে। তাই তিনিও বাদ পড়ার তালিকায় রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে যারা বাদ পড়ছেন
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি দাবি করেন, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো। তবে একটি ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম বলছে, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি নয়। ব্যক্তিগত আচরণের এমন বিতর্কও তার মন্ত্রিসভায় টিকে থাকার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়াও একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মামলায় প্রভাব খাটানো ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তা নিয়ে নেতিবাচক আলোচনার প্রেক্ষাপটে প্রভাবশালী সাবেক এক মন্ত্রীর পুত্র ও প্রভাবশলী এক প্রতিমন্ত্রীকেও বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হতে পারে বল জানা গেছে।
মন্ত্রিসভায় আসতে পারেন যারা
মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়ার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পাশাপাশি নতুন মুখ যুক্ত করার প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহাদী আমিন। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিতকে পূর্ণ মন্ত্রী করার চিন্তা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
নতুন মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় আছেন বিএনপির সিনিয়র নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, আব্দুস সালাম আজাদ, অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া, খন্দকার আবু আশফাক, নজরুল ইসলাম আজাদ ও মো. মজিবুর রহমান। টেকনোক্র্যাট কোটায়ও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম বিবেচনায় আছে। পাশাপাশি জোটের শরিক দল থেকেও নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।
তবে মন্ত্রিসভার আকার কতটা বাড়বে এবং কাদের স্থান দেওয়া হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর। ওয়াকেবহাল সূত্র বলছে, বাদ পড়া ব্যক্তিদের সংখ্যা খুব বেশি হলে সরকারের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন তারেক রহমান। তাই যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলনামূলক কম, তাদের সতর্ক করে সুযোগ দেওয়ার নীতিও নিতে পারেন তিনি।
সরকার যা বলছে
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারের নির্দিষ্ট সময় পর কাজের মূল্যায়ন করা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মূল্যায়নের ভিত্তিতে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর।
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন বলেন, সরকারের কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনা স্বাভাবিক বিষয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নুরুল আমিন বেপারীর মতে, কার্যকর প্রশাসন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনাই স্বাভাবিক। বিতর্ক এড়িয়ে প্রশাসনের গতি বাড়ানোই এমন সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হতে পারে।
এদিকে রাষ্ট্রপতির শূন্যপদে বিএনপির প্রার্থী বাছাই শনিবার জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভা হবে বলে জানা গেছে। সূত্র বলছে, দলের ভেতর থেকে রাষ্ট্রপতি করার বিবেচনায় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এগিয়ে আছেন। দলের বাইরে থেকে রাষ্ট্রপতি করার প্রস্তাবও তারেক রহমানের ভাবনায় রয়েছে। এছাড়া সংসদ উপনেতা নির্বাচনের ব্যাপারেও এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এছাড়াও, মন্ত্রিপরিষদে রদবদলের বিষয়েও প্রাথমিক আলোচনা হতে পারে বলে জানা গেছে।










