লোকসমাচার ডেস্ক:রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দুই দিনের সফরে ভারতে পৌঁছেছেন। সফরটিকে ঘিরে ধারণা করা হচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা খাতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হতে পারে।
পুতিন এমন এক সময়ে ভারতে এসেছেন, যখন রাশিয়ার জ্বালানি তেল কেনা কমাতে ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগ বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে বৈশ্বিক রাজনীতিও বেশ উত্তপ্ত, ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক পরিবর্তন, ট্রাম্পের সম্ভাব্য বাণিজ্য যুদ্ধের হুমকি এবং এশিয়ায় শক্তির নতুন ভারসাম্য, সব মিলিয়ে ভারত এখন চেষ্টা করছে তার দীর্ঘদিনের মিত্র রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক কতটা দৃঢ় রাখা যায়।
যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও ভারতের ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে ভারত শুরু থেকেই একটি মধ্যপন্থা নিয়েছে, জাতিসংঘে ভোটদানে বিরত থাকা, আলোচনা দিয়ে সমাধানের আহ্বান এবং একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখা।
বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের এই সফর পশ্চিমা বিশ্বকে একটি বার্তা দিচ্ছে, ভারত কোনো পক্ষাবলম্বী হতে রাজি নয়, বরং নিজস্ব কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে এগোতে চায়। তবে এই কৌশল ধরে রাখার মধ্যেই ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ,আমেরিকার চাপ সামলে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখা।
জ্বালানি তেলের হিসাব-নিকাশ
রাশিয়া–ভারত সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি এখন জ্বালানি। যুদ্ধের আগে রাশিয়া থেকে সামান্য তেল আমদানি করলেও, নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া ভারতকে বড় ছাড়ে তেল বিক্রি শুরু করে। এখন ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে রাশিয়া থেকে।
২০২৫ সালের মার্চ নাগাদ দুই দেশের বাণিজ্য বেড়ে ৬৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যেখানে ভারত প্রধানত তেল আমদানি করছে, কিন্তু রাশিয়ায় রপ্তানি তুলনামূলক কম। তাই এই সফরে দীর্ঘমেয়াদী তেল সরবরাহ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্যসূচি হতে পারে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও এস-৫০০ নিয়ে আলোচনা
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির কারণে ভারত কিছুটা রাশিয়ান তেল কেনা কমালেও প্রতিরক্ষা খাতে দুই দেশের সম্পর্ক এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
সোভিয়েত আমল থেকে ভারতীয় সামরিক ব্যবস্থায় রাশিয়ার অস্ত্রশস্ত্রের গভীর প্রভাব রয়েছে, বিশেষত আধুনিক যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পর্যন্ত। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ফ্রান্স, আমেরিকা ও ইসরায়েলের দিকেও নজর দিয়েছে, তবুও রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখনও প্রবল।
ভারত রাশিয়ার এস–৫০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সর্বাধুনিক এসইউ–৫৭ যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে। পাকিস্তান যখন চীনের জে–৩৫ স্টেলথ বিমান কিনছে, তখন ভারতও সমতুল্য ক্ষমতা অর্জনের দিকে ঝুঁকছে।
শ্রম, বাণিজ্য ও অন্যান্য খাত
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ায় শ্রমিক সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে রাশিয়া ভারতকে দক্ষ কর্মশক্তির সম্ভাব্য উৎস হিসেবে দেখছে। অপরদিকে ভারত চাইছে স্মার্টফোন, কৃষিপণ্য, পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য আরও বেশি রাশিয়ায় রপ্তানি করতে, যাতে দুই দেশের বাণিজ্যের ভারসাম্য ঠিক থাকে।
চীন ফ্যাক্টর
পুতিনের এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চীন। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া অনেক বেশি চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। হিমালয় সীমান্ত ইস্যুতে ভারত—চীন উত্তেজনা তুঙ্গে, তাই ভারত চাইছে রাশিয়া যেন পুরোপুরি বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে না পড়ে।
দিল্লি এবার মস্কোকে বোঝাতে চায়, এশিয়ার ভূরাজনীতিতে চীনের পাশাপাশি ভারতও রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার।
নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত
পুতিনের ভারত সফর কেবল রাষ্ট্রপ্রধানদের সাক্ষাৎ নয়, বরং পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করার সুযোগ। যুক্তরাষ্ট্র–ইউরোপীয় জোট এবং চীন–রাশিয়া অক্ষের মাঝখানে ভারত নিজেকে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর নেতৃত্বে এগিয়ে নিতে চাইছে।
ভারতের বার্তা স্পষ্ট, তারা কারো প্রভাববলয়ে আবদ্ধ নয়। জাতীয় স্বার্থে তারা মার্কিন ড্রোনও নেবে, আবার রাশিয়ার তেল ও মিসাইলও কিনবে।
আগামী দুই দিনে পুতিন ও মোদির আলোচনার ফল নির্ধারণ করবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পরবর্তী ধাপ কোন দিকে যেতে পারে। তবে নিশ্চিত একটাই—বিশ্ব কূটনীতির বোর্ডে ভারত এখন কেন্দ্রে উঠে এসেছে।


























