লোকসমাচার,নীলফামারী প্রতিনিধি:সরকারি খাসজমিতে ১১টি সেমিপাকা দোকানঘর। তদন্ত প্রতিবেদনে দোকানের পজিশন বিক্রি ও ভাড়া দেওয়ার তথ্য। এমনকি পজিশন বিক্রির ডিডের কপিও সংযুক্ত হয়েছে সরকারি তদন্ত নথিতে। ২৭ ফর্দ কাগজপত্রসহ তদন্ত প্রতিবেদন পৌঁছেছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। এরপর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এরপরও প্রশ্ন রয়ে গেছে—তদন্ত হয়েছে, নথি হয়েছে, নির্দেশনাও হয়েছে, তাহলে মামলা সৃজন ও উচ্ছেদ অভিযান কোথায়? নীলফামারী সদর উপজেলার গোড়গ্রাম ইউনিয়নের হাজীগঞ্জ বাজারের কাঞ্চনপাড়া মোড় সংলগ্ন সরকারি খাসজমি ঘিরে এমনই এক প্রশ্ন সামনে এসেছে। সরকারি খাস জমি দখল ও বিক্রির তথ্য উঠে আসার পর ২৫ জুন ২০২৬ প্রশাসনিক নির্দেশনা জারির প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেছে। ২৩ আগস্ট পর্যন্ত মামলা সৃজন কিংবা উচ্ছেদ অভিযানের দৃশ্যমান অগ্রগতির নেই।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ হাজীগঞ্জ বাজারে সরকারি খাসজমিতে মসজিদের উত্তর পাশে জয়ন্ত কুমার, পিতা ব্রতনাথ রায়, তাঁর দোকানের সংলগ্ন পূর্বদিকে নতুন করে টিনের চালা তুলে পাকাঘরের ইটের গাঁথুনি শুরু করেন। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে প্রশাসনের নজরে এলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও নির্মাণকাজ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে ওই অভিযানে নির্মাণাধীন অবৈধ স্থাপনা চূড়ান্তভাবে দখলমুক্ত করা হয়নি। এরপর একই এলাকার সরকারি খাসজমিতে মো. আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে দোকানঘর নির্মাণ, পজিশন বিক্রি ও মসজিদ স্থানান্তরের অভিযোগ সামনে আসে। এর প্রতিবাদে ১২ জানুয়ারি চৌরঙ্গী মোড়ে মানববন্ধন, গণস্বাক্ষর ও জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
অভিযোগের পর প্রশাসনিক তদন্ত শুরু হয়। গোড়গ্রাম ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের ২৬ নম্বর স্মারকের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরবর্তীতে উপজেলা ভূমি অফিস, নীলফামারী সদর থেকে ৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে স্মারক নং ০৫.৪৭.৭৩৬৪.০০০.০৫.০০৭.২৬-৫৯০-এর মাধ্যমে তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কির্তনিয়াপাড়া মৌজার জে.এল. নং-১৩, হাজীগঞ্জের কাঞ্চনপাড়া মোড় সংলগ্ন বি.আর.এস. ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত আর.এস. ৮২৮ নম্বর দাগ, যার সাবেক দাগ নম্বর ১১৮১—সেখানে মো. আফজাল হোসেন, পিতা মৃত অহেদ আলীর প্রায় ০.১৫০০ একর জায়গায় ১১টি সেমিপাকা দোকানঘর রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে দোকানগুলোর পজিশন মো. রুবেল ইসলাম, শৈলেন শর্মা, মো. রেয়াজুল ইসলাম, আবু কালাম, আসাদুজ্জামান, মো. ইয়াছিন, মোরসালিন, পলাশ চন্দ্র রায় এবং জয়ন্ত কুমার-এর কাছে বিক্রি ও ভাড়া দেওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে জয়ন্ত কুমারের কাছে তিনটি দোকানের পজিশন বিক্রি হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে। ঘটনাটি শুধু দোকান নির্মাণের অভিযোগে সীমাবদ্ধ ছিল না। পজিশন বিক্রি এবং মসজিদ স্থানান্তরের মতো একাধিক বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসে।
৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সহকারী কমিশনার (ভূমি) থেকে তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের ২৭ ফর্দ সংযুক্ত করা হয়। ভূ-সম্পত্তি জবরদখলের বিষয়ে অভিযোগ গ্রহণ এবং তদন্ত মনিটরিং সংক্রান্ত জেলা কমিটির মে/২০২৬ মাসে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এস,এ শাখা হতে মো. তানজীর ইসলাম, রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর স্বাক্ষরিত ২৫ জুন ২০২৬ স্মারক ০৫.৪৭.৭৩০০.০১৬.১১. ৩৭৮.২৪-২২৪ জারি করা হয়। সভার কার্যবিবরণীর গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনাটি পাঠানো হয় সহকারী কমিশনার (ভূমি) নীলফামারী সদর-এর কাছে।
হাজীগঞ্জ বাজারের খাসজমি দখল ও বিক্রির বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোছা. মলি আক্তার বলেন, হাজীগঞ্জ বাজারে খাসজমি দখল ও বিক্রির বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি রাজস্ব সভায় উপস্থাপনের পর মামলা সৃজন ও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি রাজস্ব সভায় উপস্থাপন করা হবে। প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজস্ব সভায় বিষয়টি উপস্থাপনের পর মামলা সৃজন ও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার কথা। তবে ২৫ জুন থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও মাঠপর্যায়ে তার দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা যায়নি।
তদন্তে পজিশন বিক্রি ও ভাড়ার তথ্য এসেছে। দোকানের পজিশন বিক্রির তথ্য এসেছে। ডিডের কপি সংযুক্ত হয়েছে। মসজিদ স্থানান্তরের অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে। ২৭ ফর্দ কাগজপত্রসহ প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে গেছে। এরপর জেলা কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশও জারি হয়েছে। তারপরও মামলা সৃজন ও উচ্ছেদ অভিযান দৃশ্যমান না হওয়ায় এখন মূল প্রশ্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ঠিক কোথায় আটকে আছে?
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি খাসজমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং সরকারি সম্পত্তির পজিশন বিক্রির মতো অভিযোগ দীর্ঘসূত্রতায় যেন হারিয়ে না যায়। এখন দেখার বিষয় তদন্তের নথি কি শেষ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের অভিযানে রূপ নেয়, নাকি হাজীগঞ্জ বাজারের সরকারি খাসজমি উদ্ধারও প্রশাসনিক ফাইলের দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকে।

























