লোকসমাচার,পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি : সুন্দরবনের রাসমেলা ঘিরে উপকূলীয় অঞ্চলে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। মেলায় যেতে পূর্ণার্থী ও দর্শনার্থীদের প্রস্তুতি চলছে। প্রতিবছর কার্তিক মাসের শেষ বা অগ্রহায়ণের প্রথম দিকে শুক্লপক্ষের ভরা পূর্ণিমায় সুন্দরবনের দুবলারচর আলোরকোলে ৩ দিন ব্যাপী এ রাস মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এশিয়ার সব থেকে বড় এ সমুদ্র মেলা। আগামী ১০ নভেম্বর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত ৩ দিন ব্যাপী রাসমেলা অনুষ্ঠিত হবে। এসময় হাজারো ভ্রমণপিয়াসী পূর্ণার্থী ও দর্শনার্থীদের আগমনে মেলাস্থল উৎসব মূখর হয়ে ওঠে। মেলাকে কেন্দ্র করে সুন্দরবন উপকূলবর্তী মানুষের মধ্যে এখন উৎসব মূখর পরিবেশ বিরাজ করছে। নৌপথে মেলায় যাওয়ার জন্য ট্রলার ভাড়াসহ চলছে বিভিন্ন প্রস্তুতি। হিন্দু ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস মতে রাস পূর্ণিমায় সাগর জলে স্নানে পাপমোচন সহ মনস্কামনা পূর্ণ হয়। তবে সময়ের ব্যবধানে এখন নানা ধর্ম ও বর্ণের ভ্রমণপিয়াসু মানুষ রাস উৎসবের পাশাপাশি সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগে আসেন। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লঞ্চ, ট্রলার ও নৌকা যোগে তীর্থযাত্রী ও দর্শনার্থীরা সমবেত হয়। আসেন অসংখ্য বিদেশী পর্যটকও। তবে মেলাকে সামনে রেখে এসময় চোরা ও মৌসুমী শিকারী চক্র হরিণ শিকারে তৎপর থাকে। তবে মেলাকে ঘিরে আইন শৃংখলা বাহিনী সুন্দরবনকে ঘিরে গড়ে তোলেন কড়া নিরাপত্তা বলয়।
সূত্র জানাগেছে, সুন্দরবন সংলগ্ন উপজেলার চোরা শিকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। সুন্দরবনে প্রবেশে কড়াকড়ির মধ্যেও রাস পূর্ণিমার মেলাকে ঘিরে শিকারীদের হরিণ নিধনের সুযোগ গ্রহণ করে। চোরা শিকারীরা রাসমেলার আড়ালে হরিণ শিকারের ফাঁদ, জাল, বরশি সহ বিভিন্ন উপকরণ তৈরীতে ব্যস্ত সময় পার করছে। পরিবেশবিদের মতে মেলাকে ঘিরে হরিণ শিকারী চক্রের দৌরাত্ব আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়ে যায়। নাম না প্রকাশ শর্তে কয়েকজন শিকারী পিএনএসকে জানান, লাইলনের তৈরী ফাদ, জাল পেতে, স্পিং বসানো ফাঁদ, বিষটোপ, তীর, গুলি করে, কলার মধ্যে বরশি দিয়ে ঝুঁলিয়ে রাখা ফাঁদ ও ঘাস পাতার উপর চেতনা নাশক ঔষধ দিয়ে হরিণ শিকার করা হয়। রাসমেলা উপলক্ষ্যে ব্যাপক নিরাপত্তা গ্রহণ করা হলেও শ্যামনগর, কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, মংলা, রামপাল, সহ উপকূলীয় এলাকার শিকারীরা মেলা শুরু হওয়ার ১০/১৫ দিন আগে জেলে বা বনজীবী সেজে বনের মধ্যে প্রবেশ করে রেখে আসা শিকার করার উপকরণ। মেলার আনন্দে মেতে উঠা দর্শনার্থী ও নিরাপত্তা কর্মীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব ফাঁদ দিয়ে হরিণ শিকারের সুযোগ গ্রহণ করে। পুণ্য¯স্নানে নিরাপদে যাতায়াতের জন্য দর্শনার্থী ও তীর্থযাত্রীদের জন্য সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ আটটি পথ নির্ধারণ করেছে। এ সকল পথে বন বিভাগ, পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ড বাহিনীর টহল দল তীর্থযাত্রী ও দর্শনার্থীদের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে।
অনুমোদিত আটটি পথ হলো-বুড়িগোয়ালিনী, কোবাদক থেকে বাটুলানদী-বলনদী-পাটকোষ্টা হয়ে হংসরাজ নদী হয়ে দুবলারচর। কদমতলা হতে ইছামতি নদী, দোবেকী হয়ে আড়পাঙ্গাসিয়া-কাগাদোবেকী হয়ে দুবলার চর। কৈখালী স্টেশন হয়ে মাদার গাং, খোপড়াখালী ভাড়ানী, দোবেকী হয়ে আড়পাঙ্গাসিয়া-কাগাদোবেকী হয়ে দুবলার চর। কয়রা, কাশিয়াবাদ, খাসিটানা, বজবজা হয়ে আড়ুয়া শিবসা-শিবসা নদী-মরজাত হয়ে দুবলার চর। নলিয়ান স্টেশন হয়ে শিবসা-মরজাত নদী হয়ে দুবলার চর। ঢাংমারী অথবা চাঁদপাই স্টেশন হয়ে পশুর নদী দিয়ে দুবলারচর। বগী-বলেশ্বর-সুপতি স্টেশন-কচিখালী-শেলার চর হয়ে দুবলার চর এবং শরণখোলা স্টেশন-সুপতি স্টেশন-কচিখালী-শেলার চর হয়ে দুবলার চর।
দর্শনার্থী ও তীর্থযাত্রীরা ১০ নভেম্বর হতে ১২ নভেম্বর এ তিন দিনের জন্য অনুমতি প্রদান করা হবে এবং প্রবেশের সময় এন্ট্রি পথে নির্দিষ্ট ফি প্রদান করতে হবে। যাত্রীরা নির্ধারিত রুটের পছন্দমতো একটি মাত্র পথ ব্যবহারের সুযোগ পাবেন এবং দিনের বেলায় চলাচল করতে পারবেন। বনবিভাগের চেকিং পয়েন্ট ছাড়া অন্য কোথাও নৌকা, লঞ্চ বা ট্রলার থামানো যাবে না। প্রতিটি ট্রলারের গায়ে রং দিয়ে বিএলসি অথবা সিরিয়াল নম্বর লিখতে হবে। রাস পূর্ণিমায় আগত পুণ্যার্থীদের সুন্দরবনে প্রবেশের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট হতে প্রাপ্ত সনদপত্র সাথে রাখতে হবে। পরিবেশ দূষণ করে এমন বস্তু, মাইক বাজানো, পটকা ও বাজি ফোটানো, বিস্ফোরক দ্রব্য, দেশীয় যে কোনো অস্ত্র এবং আগ্নেয়াস্ত্র বহন থেকে যাত্রীদের বিরত থাকতে হবে। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে অবস্থানকালীন সবসময় টোকেন ও টিকেট নিজের সঙ্গে রাখতে হবে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বশিরুল আল-মামুন জানান, পশ্চিম বনবিভাগে অভিযান পরিচালনার জন্য বিভিন্ন টিম গঠন করা হবে। তীর্থযাত্রীরা যাতে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে তার জন্য সকল প্রকার সহযোগিতা করা হবে। রাসমেলাকে কেন্দ্র করে কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরী করা হবে। র্যাব সহ আইন শৃংখলা বাহিনী সার্বক্ষণিক টহলে নিয়জিত থাকবে।





















