ঢাকা ১০:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলের কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ভয়ানক নির্যাতন

  • আপডেট সময়: ০৭:৪১:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
  • ১৬৬ জন দেখেছে
Spread the love

লোকসমাচার ডেস্ক:ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর মারধর ও অনিদ্রার মতো সাধারণ নির্যাতনের খবরে বিশ্ববাসী অনেকটা অভ্যস্তই হয়ে উঠেছে। কিন্তু ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সামনে আসা বিশদ সাক্ষ্যগুলো দখলদার ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর নতুন এক ভয়াবহ ও বিকৃত বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছে।

নেগেভ মরুভূমির কুখ্যাত ‘সদে তেইমান’ সহ বিভিন্ন ইসরাইলি কারাগার ও বন্দি শিবিরগুলো এখন ফিলিস্তিনিদের ওপর পরিকল্পিত যৌন নির্যাতনের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, ফিলিস্তিনি বন্দিদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত সত্ত্বা ধ্বংস করার লক্ষ্যে সেখানে প্রশিক্ষিত কুকুর লেলিয়ে দিয়ে ধর্ষণের মতো জঘন্য নীতি কার্যকর করা হচ্ছে।

ইসরাইলের কঠোর সামরিক সেন্সরশিপের দেয়াল ভেঙে এ ভয়াবহতার বিষয়টি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে।

গত ১৮ এপ্রিল ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ইসরাইলের সাবেক সেনা সদস্য শাহেল বেন-এফ্রাইম নিজেও এ অমানবিক নির্যাতনের বিরল ও শিউরে ওঠা কাহিনির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

সদে তেইমান কেন্দ্রের দুই প্রহরীর সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর বেন-এফ্রাইম জানান, বন্দিদের ওপর যৌন নির্যাতনে কুকুরের ব্যবহার এখন ইসরাইলি বাহিনীর একটি ‘ওপেন সিক্রেট’ বিষয়। একজন প্রহরী স্বীকার করেছেন যে, তিনি এমন দৃশ্য দেখেছেন যা মুখে বর্ণনা করার মতো নয়। অন্য এক প্রহরী নিশ্চিত করেছেন, সেখানে স্টাফদের মধ্যে কুকুর দিয়ে ধর্ষণের বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচলিত এবং বিশ্বাসযোগ্য।

বি’সেলেম, ইউরো-মেডিটেরেনিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটর এবং প্যালেস্টাইন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস-এর মতো সংস্থাগুলোর তদন্তেও এ ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

তারা একে সাধারণ জিজ্ঞাসাবাদ ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে একটি ‘নির্যাতন শিবির’ হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে ইঙ্গিত দিয়েছেন, যার মূল লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের মনস্তাত্ত্বিক বিনাশ।

ইসরাইলের কারাগার থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা এমন সব পাশবিকতার বর্ণনা দিয়েছেন যা প্রচলিত সামরিক শৃঙ্খলার বাইরে। ৩৫ বছর বয়সী ‘এ.এ.’ (ছদ্মনাম), যিনি ১৯ মাস সদে তেইমানে বন্দি ছিলেন। তিনি জানান, তাকে একটি সিসিটিভি ক্যামেরাবিহীন করিডোরে নিয়ে গিয়ে নগ্ন করা হয়। সেখানে তাকে একটি প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে প্রায় তিন মিনিট ধরে পাশবিক নির্যাতন করা হয়। এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত ইসরাইলি সৈন্যরা হাসাহাসি করছিল এবং তার যন্ত্রণা বাড়াতে মুখে পেপার স্প্রে ছিটিয়ে দিচ্ছিল।

৪৩ বছর বয়সী ওয়াজদি নামে অন্য এক বন্দি জানান, তাকে লোহার বিছানায় বেঁধে সৈন্য এবং কুকুর উভয়ই ধর্ষণ করেছিল। সৈন্যরা পুরো ঘটনাটি ভিডিও করছিল যাতে ভবিষ্যতে তাকে ব্ল্যাকমেইল করা যায়।

অন্য একটি তথ্যে জানা যায়, এক বন্দির যৌনাঙ্গ কুকুর কামড়ে ছিঁড়ে ফেললে তিনি অন্য এক বন্দির কোলেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান।

দায়মুক্তির আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামো

এ অমানবিকতাকে ইসরাইলের আইনি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা সুরক্ষা দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে সদে তেইমানে একটি দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় পাঁচ রিজার্ভ সৈন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু পরে তা তুলে নেওয়া হয়। উলটো কট্টরপন্থি ইসরাইলি মন্ত্রীরা অভিযুক্তদের ‘নায়ক’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে লিকুদ পার্টির সদস্য হানোচ মিলউইডস্কি প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছেন, বন্দিদের মলদ্বারে কোনো বস্তু ঢুকিয়ে দেওয়া বা যেকোনো ধরনের নির্যাতন করা বৈধ।

অন্যদিকে জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেস্কা আলবানিজ মন্তব্য করেছেন যে, এ নির্যাতন ফিলিস্তিনিদের মর্যাদা ধ্বংস করার একটি ‘কাঠামোগত অংশ’।

পশ্চিমা বিশ্বের নীরবতা

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ দুঃস্বপ্নের দায় এড়াতে পারে না। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট মাঝে মাঝে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করলেও ইসরাইলে সামরিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সুরক্ষা প্রদান বন্ধ করেনি। আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে এ ব্যর্থতা এবং জবাবদিহিতার অভাবই মূলত ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

সদে তেইমানের অন্ধকার করিডোরে যখন কুকুরের ঘেউ ঘেউ আর ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হয়, তখন বিশ্ববিবেকের নীরবতাই এ অপরাধের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্যাগ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইনফরমেশন সেভ করুন

জনপ্রিয়

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সরকারের সুনির্দিষ্ট ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিকল্পনা রয়েছে- সমাজকল্যাণ মন্ত্রী

ইসরায়েলের কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ভয়ানক নির্যাতন

আপডেট সময়: ০৭:৪১:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
Spread the love

লোকসমাচার ডেস্ক:ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর মারধর ও অনিদ্রার মতো সাধারণ নির্যাতনের খবরে বিশ্ববাসী অনেকটা অভ্যস্তই হয়ে উঠেছে। কিন্তু ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সামনে আসা বিশদ সাক্ষ্যগুলো দখলদার ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর নতুন এক ভয়াবহ ও বিকৃত বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছে।

নেগেভ মরুভূমির কুখ্যাত ‘সদে তেইমান’ সহ বিভিন্ন ইসরাইলি কারাগার ও বন্দি শিবিরগুলো এখন ফিলিস্তিনিদের ওপর পরিকল্পিত যৌন নির্যাতনের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, ফিলিস্তিনি বন্দিদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত সত্ত্বা ধ্বংস করার লক্ষ্যে সেখানে প্রশিক্ষিত কুকুর লেলিয়ে দিয়ে ধর্ষণের মতো জঘন্য নীতি কার্যকর করা হচ্ছে।

ইসরাইলের কঠোর সামরিক সেন্সরশিপের দেয়াল ভেঙে এ ভয়াবহতার বিষয়টি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে।

গত ১৮ এপ্রিল ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ইসরাইলের সাবেক সেনা সদস্য শাহেল বেন-এফ্রাইম নিজেও এ অমানবিক নির্যাতনের বিরল ও শিউরে ওঠা কাহিনির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

সদে তেইমান কেন্দ্রের দুই প্রহরীর সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর বেন-এফ্রাইম জানান, বন্দিদের ওপর যৌন নির্যাতনে কুকুরের ব্যবহার এখন ইসরাইলি বাহিনীর একটি ‘ওপেন সিক্রেট’ বিষয়। একজন প্রহরী স্বীকার করেছেন যে, তিনি এমন দৃশ্য দেখেছেন যা মুখে বর্ণনা করার মতো নয়। অন্য এক প্রহরী নিশ্চিত করেছেন, সেখানে স্টাফদের মধ্যে কুকুর দিয়ে ধর্ষণের বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচলিত এবং বিশ্বাসযোগ্য।

বি’সেলেম, ইউরো-মেডিটেরেনিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটর এবং প্যালেস্টাইন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস-এর মতো সংস্থাগুলোর তদন্তেও এ ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

তারা একে সাধারণ জিজ্ঞাসাবাদ ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে একটি ‘নির্যাতন শিবির’ হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে ইঙ্গিত দিয়েছেন, যার মূল লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের মনস্তাত্ত্বিক বিনাশ।

ইসরাইলের কারাগার থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা এমন সব পাশবিকতার বর্ণনা দিয়েছেন যা প্রচলিত সামরিক শৃঙ্খলার বাইরে। ৩৫ বছর বয়সী ‘এ.এ.’ (ছদ্মনাম), যিনি ১৯ মাস সদে তেইমানে বন্দি ছিলেন। তিনি জানান, তাকে একটি সিসিটিভি ক্যামেরাবিহীন করিডোরে নিয়ে গিয়ে নগ্ন করা হয়। সেখানে তাকে একটি প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে প্রায় তিন মিনিট ধরে পাশবিক নির্যাতন করা হয়। এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত ইসরাইলি সৈন্যরা হাসাহাসি করছিল এবং তার যন্ত্রণা বাড়াতে মুখে পেপার স্প্রে ছিটিয়ে দিচ্ছিল।

৪৩ বছর বয়সী ওয়াজদি নামে অন্য এক বন্দি জানান, তাকে লোহার বিছানায় বেঁধে সৈন্য এবং কুকুর উভয়ই ধর্ষণ করেছিল। সৈন্যরা পুরো ঘটনাটি ভিডিও করছিল যাতে ভবিষ্যতে তাকে ব্ল্যাকমেইল করা যায়।

অন্য একটি তথ্যে জানা যায়, এক বন্দির যৌনাঙ্গ কুকুর কামড়ে ছিঁড়ে ফেললে তিনি অন্য এক বন্দির কোলেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান।

দায়মুক্তির আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামো

এ অমানবিকতাকে ইসরাইলের আইনি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা সুরক্ষা দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে সদে তেইমানে একটি দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় পাঁচ রিজার্ভ সৈন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু পরে তা তুলে নেওয়া হয়। উলটো কট্টরপন্থি ইসরাইলি মন্ত্রীরা অভিযুক্তদের ‘নায়ক’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে লিকুদ পার্টির সদস্য হানোচ মিলউইডস্কি প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছেন, বন্দিদের মলদ্বারে কোনো বস্তু ঢুকিয়ে দেওয়া বা যেকোনো ধরনের নির্যাতন করা বৈধ।

অন্যদিকে জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেস্কা আলবানিজ মন্তব্য করেছেন যে, এ নির্যাতন ফিলিস্তিনিদের মর্যাদা ধ্বংস করার একটি ‘কাঠামোগত অংশ’।

পশ্চিমা বিশ্বের নীরবতা

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ দুঃস্বপ্নের দায় এড়াতে পারে না। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট মাঝে মাঝে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করলেও ইসরাইলে সামরিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সুরক্ষা প্রদান বন্ধ করেনি। আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে এ ব্যর্থতা এবং জবাবদিহিতার অভাবই মূলত ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

সদে তেইমানের অন্ধকার করিডোরে যখন কুকুরের ঘেউ ঘেউ আর ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হয়, তখন বিশ্ববিবেকের নীরবতাই এ অপরাধের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।