ঢাকা ০৩:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভবদহে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, তবুও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান নেই নদী খনন, স্লুইসগেট, আমডাঙ্গা খাল ও টিআরএম—কোথায় আটকে আছে ভবদহের পানি নিষ্কাশন?

  • আপডেট সময়: ০৬:৩৮:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২৪৩ জন দেখেছে
Spread the love

লোকসমাচার,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যশোর:
বর্ষা এলেই একই চিত্র। বাড়ির উঠানে পানি, ঘরের ভেতরে পানি, সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিতে ডুবে যায়। গবাদিপশু নিয়ে অনেক পরিবারকে আশ্রয় নিতে হয় উঁচু সড়কে। তিন মাস ধরে জলাবদ্ধতায় থাকা পরিবারগুলোর কাছে ভবদহ এখন শুধু একটি ভৌগোলিক এলাকার নাম নয়—এটি দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের প্রতিশব্দ।
সাম্প্রতিক সময়ে যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার ভবদহ অঞ্চলের শতাধিক গ্রামে জলাবদ্ধতার খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগের কথা উঠে এসেছে। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমি পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—প্রতি বছর একই সমস্যা কেন ফিরে আসে?

একটি সমস্যার পেছনে একাধিক কারণ
ভবদহ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে শ্রী, টেকা, মুক্তেশ্বরী, হরি ও হরিহরসহ বিভিন্ন নদী-নদী ও খালের সংযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, এসব জলপ্রবাহে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভবদহ স্লুইসগেট দিয়েও বিপুল এলাকার পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রয়েছে।

অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু অতিবৃষ্টির নয়; বৃষ্টির পানি কোথা দিয়ে, কত দ্রুত এবং কোন ব্যবস্থায় নদীতে গিয়ে পড়বে—সেই পুরো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকারিতাই এখানে বড় প্রশ্ন।
১৪০ কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্প

ভবদহ সমস্যার সমাধানে সর্বশেষ বড় উদ্যোগগুলোর একটি হলো প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন প্রকল্প। প্রকল্পের আওতায় হরি, তেলিগাতী, হরিহর, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদীর বিভিন্ন অংশ পুনঃখননের কথা রয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিন্তু অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই—
নদী খননে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও যদি বর্ষায় আবার শতাধিক গ্রাম পানিতে ডুবে যায়, তাহলে প্রকল্পের বাস্তব ফলাফল কী?

এ প্রশ্নের উত্তর শুধু নদী খননের পরিমাণ দিয়ে পাওয়া যাবে না। খননকাজ কোথায় হয়েছে, কতটুকু হয়েছে, খননের পর নদীর পানি প্রবাহ কতটা বেড়েছে এবং খননকাজের সঙ্গে অন্যান্য নিষ্কাশনব্যবস্থার সমন্বয় কতটা হয়েছে—এসব তথ্যও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।
আমডাঙ্গা খাল: আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

ভবদহের পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে আমডাঙ্গা খাল নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্থানীয়দের অভিযোগ এসেছে, খালটির সংস্কার ও প্রয়োজনীয় উন্নয়ন না হওয়ায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই খাল দিয়ে ভবদহ এলাকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি নিষ্কাশনের সুযোগ রয়েছে। একই প্রতিবেদনে খাল সংস্কারের কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগও উঠে এসেছে।

তাই অনুসন্ধানের প্রশ্ন—

যে খাল পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে, সেটির পূর্ণ সক্ষমতা কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না?
টিআরএম নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক
ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আলোচনায় বারবার উঠে আসে টিআরএম—টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট বা জোয়ারাধার।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি দীর্ঘদিন ধরে বিল কপালিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় টিআরএম বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, নদীতে পলি জমার প্রক্রিয়া মোকাবিলায় টিআরএম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে টিআরএম বাস্তবায়ন নিয়ে অতীতে সরকারি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত, প্রকল্প প্রস্তাব এবং স্থানীয় জনগণের মতামত নিয়ে বিরোধও হয়েছে।

এখানে তাই আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন—
টিআরএম নিয়ে এত বছর আলোচনা ও আন্দোলনের পরও স্থায়ী, গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো যাচ্ছে না কেন?

প্রকল্প হয়েছে, কিন্তু সমস্যা কেন থেকে যাচ্ছে?
ভবদহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। নদী খনন, স্লুইসগেট পরিচালনা, পানি নিষ্কাশন, খাল সংস্কার ও টিআরএম—বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদ্ধতির কথা এসেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে সরকারের পক্ষ থেকেও ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে চার দশকে ভবদহ সমস্যার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—এত উদ্যোগের পরও কেন প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগ ফিরে আসে।

এখানেই ভবদহের সবচেয়ে বড় অনুসন্ধানী প্রশ্নটি দাঁড়ায়—

অর্থ ব্যয় হয়েছে, প্রকল্প হয়েছে, নদী খনন হয়েছে—তাহলে স্থায়ী সমাধান হলো না কেন?
এর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু নতুন প্রকল্প ঘোষণা নয়; আগের প্রকল্পগুলোর ব্যয়, কাজের পরিমাণ, কাজের মান, বাস্তব অগ্রগতি এবং প্রকল্প শেষে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা—সবকিছুর নিরপেক্ষ অডিট প্রয়োজন।
পাউবোর বক্তব্য কী?

আগের এক প্রতিবেদনে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি জানিয়েছিলেন, খর্নিয়া সেতুর প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ভবদহের কয়েকটি স্লুইসগেট খুলে দেওয়া হয়েছে; তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গেট দিয়ে পানি নামছিল এবং পরিস্থিতির উন্নতির আশা ছিল।

অর্থাৎ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দৃষ্টিতে তাৎক্ষণিক পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা হলো—সেপ্টেম্বরেও ভবদহ এলাকার মানুষের জলাবদ্ধতার দুর্ভোগের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

লোকসমাচারের অনুসন্ধানের প্রশ্ন
ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অন্তত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর চাওয়া প্রয়োজন—
১. গত কয়েক দশকে ভবদহের পানি নিষ্কাশনে মোট কত টাকা ব্যয় হয়েছে?
২. কোন প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ ও ব্যয় হয়েছে?
৩. কোন প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে, কোনটি অসম্পূর্ণ?
৪. ১৪০ কোটি টাকার নদী পুনঃখনন প্রকল্পের বর্তমান বাস্তব অগ্রগতি কত?
৫. খনন করা নদীগুলোর পানি ধারণ ও প্রবাহক্ষমতা কতটা বেড়েছে?
৬. আমডাঙ্গা খালের সংস্কার ও উন্নয়নের বর্তমান অবস্থা কী?
৭. বিল কপালিয়ায় টিআরএম বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের বর্তমান সিদ্ধান্ত কী?
৮. আগের প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করতে কোনো স্বাধীন মূল্যায়ন বা অডিট হয়েছে কি না?
৯. প্রতিবছর বর্ষায় একই এলাকায় আবার জলাবদ্ধতা হলে পূর্বের প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার দায় কার?
শেষ কথা
ভবদহের মানুষ নতুন করে কোনো প্রতিশ্রুতির চেয়ে স্থায়ী পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা চায়—এটাই মাঠপর্যায়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি।
একদিকে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প, অন্যদিকে প্রতিবছর পানিবন্দী মানুষের জীবন—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ভবদহে শুধু পানি জমছে না; জমছে বছরের পর বছর ধরে নেওয়া সিদ্ধান্ত, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থ ব্যয়ের হিসাবও। তাই ভবদহ সমস্যার সমাধানে নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি পুরোনো প্রকল্পগুলোর পূর্ণাঙ্গ হিসাব, কাজের মান, বাস্তব ফলাফল এবং দায়-দায়িত্বের স্বচ্ছ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

লোকসমাচারের অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।

ট্যাগ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইনফরমেশন সেভ করুন

জনপ্রিয়

‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ভবদহে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, তবুও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান নেই নদী খনন, স্লুইসগেট, আমডাঙ্গা খাল ও টিআরএম—কোথায় আটকে আছে ভবদহের পানি নিষ্কাশন?

আপডেট সময়: ০৬:৩৮:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Spread the love

লোকসমাচার,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যশোর:
বর্ষা এলেই একই চিত্র। বাড়ির উঠানে পানি, ঘরের ভেতরে পানি, সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিতে ডুবে যায়। গবাদিপশু নিয়ে অনেক পরিবারকে আশ্রয় নিতে হয় উঁচু সড়কে। তিন মাস ধরে জলাবদ্ধতায় থাকা পরিবারগুলোর কাছে ভবদহ এখন শুধু একটি ভৌগোলিক এলাকার নাম নয়—এটি দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের প্রতিশব্দ।
সাম্প্রতিক সময়ে যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার ভবদহ অঞ্চলের শতাধিক গ্রামে জলাবদ্ধতার খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগের কথা উঠে এসেছে। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমি পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—প্রতি বছর একই সমস্যা কেন ফিরে আসে?

একটি সমস্যার পেছনে একাধিক কারণ
ভবদহ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে শ্রী, টেকা, মুক্তেশ্বরী, হরি ও হরিহরসহ বিভিন্ন নদী-নদী ও খালের সংযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, এসব জলপ্রবাহে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভবদহ স্লুইসগেট দিয়েও বিপুল এলাকার পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রয়েছে।

অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু অতিবৃষ্টির নয়; বৃষ্টির পানি কোথা দিয়ে, কত দ্রুত এবং কোন ব্যবস্থায় নদীতে গিয়ে পড়বে—সেই পুরো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকারিতাই এখানে বড় প্রশ্ন।
১৪০ কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্প

ভবদহ সমস্যার সমাধানে সর্বশেষ বড় উদ্যোগগুলোর একটি হলো প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন প্রকল্প। প্রকল্পের আওতায় হরি, তেলিগাতী, হরিহর, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদীর বিভিন্ন অংশ পুনঃখননের কথা রয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিন্তু অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই—
নদী খননে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও যদি বর্ষায় আবার শতাধিক গ্রাম পানিতে ডুবে যায়, তাহলে প্রকল্পের বাস্তব ফলাফল কী?

এ প্রশ্নের উত্তর শুধু নদী খননের পরিমাণ দিয়ে পাওয়া যাবে না। খননকাজ কোথায় হয়েছে, কতটুকু হয়েছে, খননের পর নদীর পানি প্রবাহ কতটা বেড়েছে এবং খননকাজের সঙ্গে অন্যান্য নিষ্কাশনব্যবস্থার সমন্বয় কতটা হয়েছে—এসব তথ্যও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।
আমডাঙ্গা খাল: আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

ভবদহের পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে আমডাঙ্গা খাল নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্থানীয়দের অভিযোগ এসেছে, খালটির সংস্কার ও প্রয়োজনীয় উন্নয়ন না হওয়ায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই খাল দিয়ে ভবদহ এলাকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি নিষ্কাশনের সুযোগ রয়েছে। একই প্রতিবেদনে খাল সংস্কারের কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগও উঠে এসেছে।

তাই অনুসন্ধানের প্রশ্ন—

যে খাল পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে, সেটির পূর্ণ সক্ষমতা কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না?
টিআরএম নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক
ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আলোচনায় বারবার উঠে আসে টিআরএম—টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট বা জোয়ারাধার।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি দীর্ঘদিন ধরে বিল কপালিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় টিআরএম বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, নদীতে পলি জমার প্রক্রিয়া মোকাবিলায় টিআরএম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে টিআরএম বাস্তবায়ন নিয়ে অতীতে সরকারি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত, প্রকল্প প্রস্তাব এবং স্থানীয় জনগণের মতামত নিয়ে বিরোধও হয়েছে।

এখানে তাই আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন—
টিআরএম নিয়ে এত বছর আলোচনা ও আন্দোলনের পরও স্থায়ী, গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো যাচ্ছে না কেন?

প্রকল্প হয়েছে, কিন্তু সমস্যা কেন থেকে যাচ্ছে?
ভবদহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। নদী খনন, স্লুইসগেট পরিচালনা, পানি নিষ্কাশন, খাল সংস্কার ও টিআরএম—বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদ্ধতির কথা এসেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে সরকারের পক্ষ থেকেও ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে চার দশকে ভবদহ সমস্যার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—এত উদ্যোগের পরও কেন প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগ ফিরে আসে।

এখানেই ভবদহের সবচেয়ে বড় অনুসন্ধানী প্রশ্নটি দাঁড়ায়—

অর্থ ব্যয় হয়েছে, প্রকল্প হয়েছে, নদী খনন হয়েছে—তাহলে স্থায়ী সমাধান হলো না কেন?
এর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু নতুন প্রকল্প ঘোষণা নয়; আগের প্রকল্পগুলোর ব্যয়, কাজের পরিমাণ, কাজের মান, বাস্তব অগ্রগতি এবং প্রকল্প শেষে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা—সবকিছুর নিরপেক্ষ অডিট প্রয়োজন।
পাউবোর বক্তব্য কী?

আগের এক প্রতিবেদনে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি জানিয়েছিলেন, খর্নিয়া সেতুর প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ভবদহের কয়েকটি স্লুইসগেট খুলে দেওয়া হয়েছে; তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গেট দিয়ে পানি নামছিল এবং পরিস্থিতির উন্নতির আশা ছিল।

অর্থাৎ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দৃষ্টিতে তাৎক্ষণিক পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা হলো—সেপ্টেম্বরেও ভবদহ এলাকার মানুষের জলাবদ্ধতার দুর্ভোগের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

লোকসমাচারের অনুসন্ধানের প্রশ্ন
ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অন্তত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর চাওয়া প্রয়োজন—
১. গত কয়েক দশকে ভবদহের পানি নিষ্কাশনে মোট কত টাকা ব্যয় হয়েছে?
২. কোন প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ ও ব্যয় হয়েছে?
৩. কোন প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে, কোনটি অসম্পূর্ণ?
৪. ১৪০ কোটি টাকার নদী পুনঃখনন প্রকল্পের বর্তমান বাস্তব অগ্রগতি কত?
৫. খনন করা নদীগুলোর পানি ধারণ ও প্রবাহক্ষমতা কতটা বেড়েছে?
৬. আমডাঙ্গা খালের সংস্কার ও উন্নয়নের বর্তমান অবস্থা কী?
৭. বিল কপালিয়ায় টিআরএম বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের বর্তমান সিদ্ধান্ত কী?
৮. আগের প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করতে কোনো স্বাধীন মূল্যায়ন বা অডিট হয়েছে কি না?
৯. প্রতিবছর বর্ষায় একই এলাকায় আবার জলাবদ্ধতা হলে পূর্বের প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার দায় কার?
শেষ কথা
ভবদহের মানুষ নতুন করে কোনো প্রতিশ্রুতির চেয়ে স্থায়ী পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা চায়—এটাই মাঠপর্যায়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি।
একদিকে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প, অন্যদিকে প্রতিবছর পানিবন্দী মানুষের জীবন—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ভবদহে শুধু পানি জমছে না; জমছে বছরের পর বছর ধরে নেওয়া সিদ্ধান্ত, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থ ব্যয়ের হিসাবও। তাই ভবদহ সমস্যার সমাধানে নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি পুরোনো প্রকল্পগুলোর পূর্ণাঙ্গ হিসাব, কাজের মান, বাস্তব ফলাফল এবং দায়-দায়িত্বের স্বচ্ছ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

লোকসমাচারের অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।