ঢাকা ০৮:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুন্দরবনে বনরক্ষীদের অভিযানে হরিণ শিকারের বিশাল ফাঁদ ও ট্রলার জব্দ

  • আপডেট সময়: ০৬:৪৭:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫ জন দেখেছে
Spread the love

‎ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট:পূর্ব সুন্দরবনের নারিকেলবাড়িয়া এলাকায় শুক্রবার ভোরে অভিযান চালিয়ে একটি ট্রলারসহ চার বস্তা হরিণ শিকারের মালা ফাঁদ জব্দ করেছে বনরক্ষীরা। বনরক্ষীদের উপস্থিতি টের পেয়ে অজ্ঞাতনামা শিকারীরা সুন্দরবনের গভীরে

‎শুক্রবার ভোরে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের নারিকেলবাড়িয়া এলাকায় বনরক্ষীদের নিয়মিত টহল দলের তৎপরতায় একটি বড় ধরনের হরিণ শিকারের অপচেষ্টা নস্যাৎ করা হয়েছে। শেলারচর টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্টার মো. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে বনরক্ষীরা একটি সন্দেহভাজন ট্রলারকে থামার নির্দেশ দিলে ৬ থেকে ৭ জন শিকারী ট্রলারটি বনের পাড়ে ভিড়িয়ে সুন্দরবনের ভেতর পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরবর্তী সময়ে তল্লাশি চালিয়ে ওই ট্রলার থেকে চার বস্তা ভর্তি বিপুল পরিমাণ হরিণ শিকারের মালা ফাঁদ জব্দ করা হয়। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য ও নিয়মিত নজরদারির অংশ হিসেবেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং শিকারীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বনের ভেতরে প্রবেশ করে অবৈধভাবে হরিণ শিকার করা। পালিয়ে যাওয়া শিকারীরা সংখ্যায় ৬ থেকে ৭ জন ছিল বলে নিশ্চিত করা হয়েছে এবং তাদের আটকের জন্য বন বিভাগের পক্ষ থেকে তৎপরতা শুরু হয়েছে।

‎অভিযানের সময় ট্রলারটি সাগরের ঢেউয়ের তোড়ে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলে বনরক্ষীরা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সেটিকে টেনে শেলারচরে নিয়ে আসে এবং তল্লাশি চালিয়ে বস্তাভর্তি মালা ফাঁদগুলো উদ্ধার করে। শেলারচর টহল ফাঁড়ির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, শিকারী চক্রটি অত্যন্ত সুকৌশলে ককশিটের বাক্স ভর্তি বরফ এবং শিকারের অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে সমুদ্রপথ ব্যবহার করে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছিল। ট্রলারটি সাগরে কিছুটা ডুবে যাওয়ায় বরফসহ কিছু লজিস্টিক সাপোর্ট ভেসে গেলেও মূল হাতিয়ার তথা চার বস্তা মালা ফাঁদ বনরক্ষীদের হাতে চলে আসে। এই ফাঁদগুলোর উপস্থিতি স্পষ্ট করে যে, চক্রটি বড় কোনো প্রস্তুতি নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেছিল এবং তাদের লক্ষ্য ছিল নির্দিষ্ট কোনো চরে ফাঁদ পেতে নির্বিচারে হরিণ হত্যা করা। দীর্ঘ দিন ধরে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পেছনে এই ধরনের সংঘবদ্ধ শিকারী চক্রগুলো সক্রিয় রয়েছে এবং তাদের এই অপতৎপরতা রোধে বন বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের নিয়মিত টহল ও কড়া নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

‎ঘটনার পর সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পালিয়ে যাওয়া অজ্ঞাতপরিচয় শিকারীদের শনাক্ত করতে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে বন আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। শরণখোলা রেঞ্জের এসিএফ মো. শরীফুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, বনের প্রাণিসম্পদ রক্ষায় বনরক্ষীরা সবসময় কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং কোনো অবস্থাতেই চোরা শিকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না। বন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ধরনের সফল অভিযਾਨের মাধ্যমে শিকারী চক্রগুলোর মনোবল ভেঙে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে কেবল ফাঁদ বা ট্রলার জব্দ করাই যথেষ্ট নয়, বরং এই চক্রের সাথে জড়িত স্থানীয় বা বাহ্যিক কুশীলবদের শেকড় পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, প্রশাসনের আরও কঠোর নজরদারি এবং গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করার মাধ্যমে সুন্দরবনের স্পর্শকাতর এলাকায় হরিণ শিকারের এই অপতৎপরতা স্থায়ীভাবে দমন করা সম্ভব হবে।

‎সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বিশ্ব ঐতিহ্য এই বনের বন্যপ্রাণী সুরক্ষার ক্ষেত্রে হরিণ শিকারীদের এই ধরণের তৎপরতা একটি দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন এবং দুর্গম এলাকা হওয়ায় নারিকেলবাড়িয়া ও শেলারচর অঞ্চলগুলো প্রায়শই শিকারী চক্রের টার্গেটে থাকে, যা বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করে তোলে। বর্তমান ঘটনায় ট্রলার ও ফাঁদ জব্দ হলেও শিকারীদের পলায়ন প্রমাণ করে যে, এই অপরাধ চক্রগুলোর সাথে জড়িতদের ধরতে আরও নিবিড় ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। পরিবেশবাদীরা মনে করেন, সুন্দরবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেবল বন বিভাগের অভিযানই নয়, বরং স্থানীয় জেলের বেশে ঘুরে বেড়ানো অসাধু চক্রগুলোর ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী শিকারের দুঃসাহস না দেখায়।

ট্যাগ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইনফরমেশন সেভ করুন

জনপ্রিয়

হুতিদের ওপর হামলা চালাতে সৌদি যুবরাজের ফোন, ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যান

সুন্দরবনে বনরক্ষীদের অভিযানে হরিণ শিকারের বিশাল ফাঁদ ও ট্রলার জব্দ

আপডেট সময়: ০৬:৪৭:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Spread the love

‎ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট:পূর্ব সুন্দরবনের নারিকেলবাড়িয়া এলাকায় শুক্রবার ভোরে অভিযান চালিয়ে একটি ট্রলারসহ চার বস্তা হরিণ শিকারের মালা ফাঁদ জব্দ করেছে বনরক্ষীরা। বনরক্ষীদের উপস্থিতি টের পেয়ে অজ্ঞাতনামা শিকারীরা সুন্দরবনের গভীরে

‎শুক্রবার ভোরে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের নারিকেলবাড়িয়া এলাকায় বনরক্ষীদের নিয়মিত টহল দলের তৎপরতায় একটি বড় ধরনের হরিণ শিকারের অপচেষ্টা নস্যাৎ করা হয়েছে। শেলারচর টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্টার মো. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে বনরক্ষীরা একটি সন্দেহভাজন ট্রলারকে থামার নির্দেশ দিলে ৬ থেকে ৭ জন শিকারী ট্রলারটি বনের পাড়ে ভিড়িয়ে সুন্দরবনের ভেতর পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরবর্তী সময়ে তল্লাশি চালিয়ে ওই ট্রলার থেকে চার বস্তা ভর্তি বিপুল পরিমাণ হরিণ শিকারের মালা ফাঁদ জব্দ করা হয়। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য ও নিয়মিত নজরদারির অংশ হিসেবেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং শিকারীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বনের ভেতরে প্রবেশ করে অবৈধভাবে হরিণ শিকার করা। পালিয়ে যাওয়া শিকারীরা সংখ্যায় ৬ থেকে ৭ জন ছিল বলে নিশ্চিত করা হয়েছে এবং তাদের আটকের জন্য বন বিভাগের পক্ষ থেকে তৎপরতা শুরু হয়েছে।

‎অভিযানের সময় ট্রলারটি সাগরের ঢেউয়ের তোড়ে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলে বনরক্ষীরা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সেটিকে টেনে শেলারচরে নিয়ে আসে এবং তল্লাশি চালিয়ে বস্তাভর্তি মালা ফাঁদগুলো উদ্ধার করে। শেলারচর টহল ফাঁড়ির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, শিকারী চক্রটি অত্যন্ত সুকৌশলে ককশিটের বাক্স ভর্তি বরফ এবং শিকারের অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে সমুদ্রপথ ব্যবহার করে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছিল। ট্রলারটি সাগরে কিছুটা ডুবে যাওয়ায় বরফসহ কিছু লজিস্টিক সাপোর্ট ভেসে গেলেও মূল হাতিয়ার তথা চার বস্তা মালা ফাঁদ বনরক্ষীদের হাতে চলে আসে। এই ফাঁদগুলোর উপস্থিতি স্পষ্ট করে যে, চক্রটি বড় কোনো প্রস্তুতি নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেছিল এবং তাদের লক্ষ্য ছিল নির্দিষ্ট কোনো চরে ফাঁদ পেতে নির্বিচারে হরিণ হত্যা করা। দীর্ঘ দিন ধরে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পেছনে এই ধরনের সংঘবদ্ধ শিকারী চক্রগুলো সক্রিয় রয়েছে এবং তাদের এই অপতৎপরতা রোধে বন বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের নিয়মিত টহল ও কড়া নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

‎ঘটনার পর সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পালিয়ে যাওয়া অজ্ঞাতপরিচয় শিকারীদের শনাক্ত করতে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে বন আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। শরণখোলা রেঞ্জের এসিএফ মো. শরীফুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, বনের প্রাণিসম্পদ রক্ষায় বনরক্ষীরা সবসময় কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং কোনো অবস্থাতেই চোরা শিকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না। বন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ধরনের সফল অভিযਾਨের মাধ্যমে শিকারী চক্রগুলোর মনোবল ভেঙে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে কেবল ফাঁদ বা ট্রলার জব্দ করাই যথেষ্ট নয়, বরং এই চক্রের সাথে জড়িত স্থানীয় বা বাহ্যিক কুশীলবদের শেকড় পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, প্রশাসনের আরও কঠোর নজরদারি এবং গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করার মাধ্যমে সুন্দরবনের স্পর্শকাতর এলাকায় হরিণ শিকারের এই অপতৎপরতা স্থায়ীভাবে দমন করা সম্ভব হবে।

‎সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বিশ্ব ঐতিহ্য এই বনের বন্যপ্রাণী সুরক্ষার ক্ষেত্রে হরিণ শিকারীদের এই ধরণের তৎপরতা একটি দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন এবং দুর্গম এলাকা হওয়ায় নারিকেলবাড়িয়া ও শেলারচর অঞ্চলগুলো প্রায়শই শিকারী চক্রের টার্গেটে থাকে, যা বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করে তোলে। বর্তমান ঘটনায় ট্রলার ও ফাঁদ জব্দ হলেও শিকারীদের পলায়ন প্রমাণ করে যে, এই অপরাধ চক্রগুলোর সাথে জড়িতদের ধরতে আরও নিবিড় ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। পরিবেশবাদীরা মনে করেন, সুন্দরবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেবল বন বিভাগের অভিযানই নয়, বরং স্থানীয় জেলের বেশে ঘুরে বেড়ানো অসাধু চক্রগুলোর ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী শিকারের দুঃসাহস না দেখায়।