লোকসমাচার ডেস্ক:”পৃথিবীতে যা কিছু আছেমঙ্গলকর অর্ধেক করিয়াছে নারী অর্ধেক নর”উল্লেখিত বাক্য শতভাগ সত্য অথচ সেই নারীরা অনেকাংশে অবহেলিত তারই ধারাবাহিকতায় নারীরা প্রাপ্তবয়স্ক হলে অধিকাংশ নারী নীরব ঘাতক জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। নীরব ঘাতক বলা হয় একারণে যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেও এর লক্ষন অনেক সময় বোঝা যায় না। গবেষণানুযায়ি ভাইরাস প্রবেশের পর ১৫ থেকে ২০ বছরও সময় লাগে জরায়ুমুখের ক্যান্সার হতে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বিশ্বব্যাপি প্রতিবছর ৫ লাখ ৭০ হাজার নারী এই জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার নারী মারা যান। সাধারণত অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের নারীরা স্বাস্থ্য বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন না বলে এই রোগের বিস্তার বেশি। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার অনুসারে ৫০ মিলিয়ন বা ৫ কোটি বাংলাদেশী নারী জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং বছরে নতুন আক্রান্ত ১৭৬৮৬ এবং মৃত্যু ১০৩৬২।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগনের নিকট থেকে জানা যায়,হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস যা অধিকাংশ নারী তাদের জীবনের কোনও না কোনও সময় সংক্রমিত হয়। ১০০ এরও বেশি ধরনের এইচ পি ভি ভাইরাস রয়েছে,যার বেশিরভাগই জরায়ু ক্যান্সারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়। শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দ্বারা ১৮-২৪ মাসের মধ্যে জরায়ু প্রায় সব এইচ পি ভি ভাইরাস মুক্ত হয়ে যায়। তবে জরায়ুতে এইচ পি ভি ভাইরাস দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে,জরায়ু কোষে পরিবর্তনের সূত্রপাত হয় এবং ধীরে ধীরে তা ক্যান্সারে রুপ নেয়।চিকিৎসকগন জরায়ুমুখ ক্যান্সারের অন্যতম কারণ গুলো জানান বাল্যবিয়ে/একাধিক বিবাহ,অল্প বয়সে মা হওয়া,ঘন ঘন সন্তান ধারন,স্বামীর একাধিক বিবাহ বা যৌন সাথী,অপুষ্টি ইনফেকশন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া,একটানা ১০/২০ বছর জন্মনিয়ন্ত্রন বড়ি সেবন এবং ধূমপান পান জর্দা খাওয়া। লক্ষন গুলো সম্বন্ধে জানান, ১.ঋতুচক্রের নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হয়।২.অস্বাভাবিক বা গন্ধযুক্ত ভ্যাজাইনাল ডিসচার্জও হতে পারে।৩.ব্যক্তিগত মুহূর্তের পর রক্তপাত হতে পারে।৪.ঋতুবন্ধের পর রক্তপাত হয়।৫.তলপেটে কোমরে ব্যথা অনুভব হয়।
পূর্ব থেকে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধের ব্যপারে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ঝুঁকি গুলো জানা,ঝুঁকি এড়িয়ে চলা,বাল্যবিবাহ বন্ধ করা,স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপন করা,সুষম খাবারে অভ্যাস করা,দেহের পুষ্টি বজায় রাখা,নিয়মিত ভায়া,প্যাপ,এইচপিভি টেস্টে অংশ নেয়া।
প্যাপ,ভায়া টেস্ট সম্পর্কে কিছু কথা,বেশিরভাগ ক্যান্সারই আগে থেকে ধরা যায় না, ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য স্ক্রিনিং করতে হয়। প্যাপ টেস্ট করে রোগটিকে ধরা গেলে চিকিৎসা করে পুরোপুরি সারিয়ে দেওয়া যায়।এই পরীক্ষার জন্য ভর্তি হওয়ারও দরকার নেই,আউটডোর ক্লিনিকেই করা যায়। এই পরীক্ষায় জরায়ুর মুখ থেকে কিছুটা রস সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয় এবং জরায়ুমুখের কোষগুলোর পরিবর্তন বা প্রি ক্যান্সারাস স্টেজ স্ক্রিনিং করা হয়। সে রকম কিছু পাওয়া গেলে কতটা অ্যাবনর্মালিটি রয়েছে তার উপর নির্ভর করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ২৫-৬৫ বছর পযর্ন্ত মহিলাদের তিন বছর অন্তর প্যাপ টেস্ট করানো উচিত।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, জরায়ুমুখের ক্যান্সার একটি প্রতিরোধ যোগ্য রোগ।
প্রজননক্ষম নারীরা নিয়মিত একটি সহজ ও বিনামূল্যের পরীক্ষার মাধ্যমে সহজেই জরায়ুমুখের ক্যান্সার সম্পর্কে আগাম সতর্কসংকেত পেতে পারেন।
পরীক্ষাটির নাম ‘ভায়া পরীক্ষা’ বা ভিজ্যুয়াল ইনস্পেকশন উইথ এসিটিক এসিড। বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতালের পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও বিনামূল্যে এ পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
যশোরের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই বিশেষায়িত ভায়া পরীক্ষা কর্ণার চালু রয়েছে। ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালেও রয়েছে এই সেবা। পাশাপাশি জেলা স্বাস্থ্যবিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে ভায়া পরীক্ষা ক্যাম্প করাও হয়।
গত ২০২২ সালেই যশোর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ১৮,৮৪৬ জন নারীর ভায়া পরীক্ষা করে জরায়ু ক্যান্সার বিষয়ে সচেতন করা হয়েছে।
পরীক্ষাটি করাতে অনেকের মধ্যে অনীহা থাকলেও আস্তে আস্তে মানুষের মাঝে ভ্রান্ত ধারনা কমে যাচ্ছে ও এই সেবা নেওয়ার প্রবনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সচেতনতা বৃদ্ধি ও ভায়া পরীক্ষার মাধ্যমে অগ্রিম রোগ সনাক্তকরণের মাধ্যমে জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধ সম্ভব। তাই সকলকে অনুরোধ জানাবো জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে এই সেবা গ্রহণ করে নিজেকে নিরাপদ রাখুন।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের সাথে আলোচনা কালে জানা যায়,হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস ভ্যাকসিন,জরায়ুমুখ ক্যান্সারের সবচেয়ে বিপদজনক এইচপিভি ১৬ এবং ১৮ প্রতিরোধে অধিক কার্যকর যা আমাদের প্রতিটা নারী ৩ টি ভ্যাকসিন শরীরে নিতে পারলে ৯০-৯৫ ভাগ নারী নীরব ঘাতক জরায়ুমুখ ক্যান্সারের মত বিপদমুক্ত হতে পারতো।
এ প্রতিনিধি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সাথে আলোচনা করে ভ্যাকসিন ব্যবহারে নিরুৎসাহিতর কারণ জানতে পারে, প্যাপিলোমা ভ্যাকসিনের যে চড়া বাজারমূল্য তা অনেকের ক্রয় ক্ষমতার বাহিরে। সকলের দাবি সরকারি ব্যবস্থায় বিনামূল্যে ১৪-৪৫ বছরের বয়সের সারাদেশের সকল নারীদের প্যাপিলোমা ভ্যাকসিন দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করুক সরকার তথা সংশ্লিষ্ট দপ্তর।


























