ঢাকা ১১:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রক্ষকই যখন ভক্ষক!প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারে প্রস্তাবিত ভূমি অফিসের জমি ব্যক্তিগত লীজে

  • আপডেট সময়: ০৫:১৮:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬
  • ১৫৮ জন দেখেছে
Spread the love

লোকসমাচার নীলফামারী প্রতিনিধি:যে জমি সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের প্রস্তাবিত, সাইনবোর্ড ছিলো, সেই জমিই শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের নাজিরের ব্যক্তিগত লীজে।

নীলফামারী নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট সংলগ্ন পুরাতন তিস্তা ক্লিনিকের পাশে, নীলফামারী বাজার মৌজাধীন এস,এ ৪০৮ নং খতিয়ানের ৩৪৯ নং দাগের ১৫ শতক জমি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ব্যবহারেই ছিল। একসময় এটি মুখ্য পাঠ পরিদর্শকের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরে পাট অধিদপ্তর স্থানটি ছেড়ে দিলে, ২০২০ সালে তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বেলায়েত হোসেন ওই জায়গাটিকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের জন্য নির্ধারণে উদ্যোগ নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয় এবং সেখানে “প্রস্তাবিত ভূমি অফিস” উল্লেখ করে সাইনবোর্ডও স্থাপন করা হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে সেটি ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে জমি সরকারি অফিস স্থাপনের স্থান ছিল, সেই জমিতেই ২৮ মার্চ ২০২৬ সকাল থেকে ঘর নির্মাণকাজ শুরু হয়।

নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ২৪ মার্চ ২০২৬ তারিখে স্বাক্ষরিত এক আদেশে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের এস,এ শাখার রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর সুমনা পারভীন মিতা, একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে ৪৪/-৬৮-৬৯ ভূক্ত বাজার মৌজাধীন এস,এ ৪০৮ নং খতিয়ানের ৩৪৯ নং দাগের ১৫ শতক জমিতে বকেয়া লীজমানি আদায়পূর্বক সেমি-পাকা অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি দেন। প্রশ্ন উঠেছে—যে জমি সরকারি প্রয়োজনে প্রস্তাবিত ছিল, সেটিকে কী প্রক্রিয়ায় সাধারণ লীজযোগ্য জমি হিসেবে বিবেচনা করা হলো?

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই লীজের সুবিধাভোগীদের পরিচয়।
জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের নেজারেত ডেপুটি কালেক্টর শাখার নাজির মো. মমিন তার স্ত্রী মোছা. ইসরাত জাহান মিমের নামে রাস্তা-সংলগ্ন ৫ শতক জমি লীজ নেন। একইভাবে এস,এ শাখার নাজির মনিরুজ্জামান তার স্ত্রী মোছা. রুমা বেগমের নামে রাস্তা-সংলগ্ন পূর্ব পাশের ৫ শতক জমি লীজ নেন। এছাড়া শাহীপাড়ার বাসিন্দা মো. মুহীন আনছারী দক্ষিণ পাশে ৫ শতক জমি লীজ গ্রহণ করেন। জনমনে প্রশ্ন এটি কি নিছক কাকতালীয়, নাকি প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার।

বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি ঘিরে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের নোটিশে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ৩০ নং বিধিসহ সংশ্লিষ্ট বিধি যথাযথভাবে অনুসরণের নির্দেশনা রয়েছে। সেখানে সরকারি কর্মচারীর নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা, ক্ষমতার সুষ্ঠু ব্যবহার এবং স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলার বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। অথচ অভিযোগ উঠেছে, সেই বিধিমালাকেই কার্যত উপহাস করে প্রশাসনিক প্রভাব ও পদমর্যাদার সুবিধা ব্যবহার করে প্রস্তাবিত সরকারি জমি ব্যক্তিগত লীজে নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের প্রস্তাবিত জমি কীভাবে ব্যক্তিগত লীজে পরিণত হলো? কে বা কারা মাঠপর্যায়ে তদন্ত করলেন? কোন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই অনুমোদন দেওয়া হলো? জমির সরকারি প্রস্তাবনার তথ্য কি ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রাখা হয়েছিল? নাকি জেনেশুনেই ব্যক্তি-দখলের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে?

সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোছা: মলি আক্তার বলেন, জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কে জানানো হয়েছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ সাইদুল ইসলাম বলেন, লীজ বাতিল করা হবে এবং উক্ত জমিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সদরের সাইনবোর্ড স্থাপন করা হবে।

ট্যাগ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইনফরমেশন সেভ করুন

জনপ্রিয়

দেশে ৮৮ শতাংশ পরিবার আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করছে, শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিতের আহ্বান প্রতিমন্ত্রীর

রক্ষকই যখন ভক্ষক!প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারে প্রস্তাবিত ভূমি অফিসের জমি ব্যক্তিগত লীজে

আপডেট সময়: ০৫:১৮:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬
Spread the love

লোকসমাচার নীলফামারী প্রতিনিধি:যে জমি সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের প্রস্তাবিত, সাইনবোর্ড ছিলো, সেই জমিই শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের নাজিরের ব্যক্তিগত লীজে।

নীলফামারী নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট সংলগ্ন পুরাতন তিস্তা ক্লিনিকের পাশে, নীলফামারী বাজার মৌজাধীন এস,এ ৪০৮ নং খতিয়ানের ৩৪৯ নং দাগের ১৫ শতক জমি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ব্যবহারেই ছিল। একসময় এটি মুখ্য পাঠ পরিদর্শকের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরে পাট অধিদপ্তর স্থানটি ছেড়ে দিলে, ২০২০ সালে তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বেলায়েত হোসেন ওই জায়গাটিকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের জন্য নির্ধারণে উদ্যোগ নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয় এবং সেখানে “প্রস্তাবিত ভূমি অফিস” উল্লেখ করে সাইনবোর্ডও স্থাপন করা হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে সেটি ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে জমি সরকারি অফিস স্থাপনের স্থান ছিল, সেই জমিতেই ২৮ মার্চ ২০২৬ সকাল থেকে ঘর নির্মাণকাজ শুরু হয়।

নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ২৪ মার্চ ২০২৬ তারিখে স্বাক্ষরিত এক আদেশে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের এস,এ শাখার রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর সুমনা পারভীন মিতা, একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে ৪৪/-৬৮-৬৯ ভূক্ত বাজার মৌজাধীন এস,এ ৪০৮ নং খতিয়ানের ৩৪৯ নং দাগের ১৫ শতক জমিতে বকেয়া লীজমানি আদায়পূর্বক সেমি-পাকা অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি দেন। প্রশ্ন উঠেছে—যে জমি সরকারি প্রয়োজনে প্রস্তাবিত ছিল, সেটিকে কী প্রক্রিয়ায় সাধারণ লীজযোগ্য জমি হিসেবে বিবেচনা করা হলো?

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই লীজের সুবিধাভোগীদের পরিচয়।
জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের নেজারেত ডেপুটি কালেক্টর শাখার নাজির মো. মমিন তার স্ত্রী মোছা. ইসরাত জাহান মিমের নামে রাস্তা-সংলগ্ন ৫ শতক জমি লীজ নেন। একইভাবে এস,এ শাখার নাজির মনিরুজ্জামান তার স্ত্রী মোছা. রুমা বেগমের নামে রাস্তা-সংলগ্ন পূর্ব পাশের ৫ শতক জমি লীজ নেন। এছাড়া শাহীপাড়ার বাসিন্দা মো. মুহীন আনছারী দক্ষিণ পাশে ৫ শতক জমি লীজ গ্রহণ করেন। জনমনে প্রশ্ন এটি কি নিছক কাকতালীয়, নাকি প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার।

বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি ঘিরে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের নোটিশে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ৩০ নং বিধিসহ সংশ্লিষ্ট বিধি যথাযথভাবে অনুসরণের নির্দেশনা রয়েছে। সেখানে সরকারি কর্মচারীর নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা, ক্ষমতার সুষ্ঠু ব্যবহার এবং স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলার বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। অথচ অভিযোগ উঠেছে, সেই বিধিমালাকেই কার্যত উপহাস করে প্রশাসনিক প্রভাব ও পদমর্যাদার সুবিধা ব্যবহার করে প্রস্তাবিত সরকারি জমি ব্যক্তিগত লীজে নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের প্রস্তাবিত জমি কীভাবে ব্যক্তিগত লীজে পরিণত হলো? কে বা কারা মাঠপর্যায়ে তদন্ত করলেন? কোন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই অনুমোদন দেওয়া হলো? জমির সরকারি প্রস্তাবনার তথ্য কি ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রাখা হয়েছিল? নাকি জেনেশুনেই ব্যক্তি-দখলের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে?

সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোছা: মলি আক্তার বলেন, জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কে জানানো হয়েছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ সাইদুল ইসলাম বলেন, লীজ বাতিল করা হবে এবং উক্ত জমিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সদরের সাইনবোর্ড স্থাপন করা হবে।