লোকসমাচার ডেস্ক:হিমালয়ের বিতর্কিত অঞ্চলে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যকার সীমানাকে বহু দশক ধরেই স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে ভারত, যা নয়া দিল্লি সম্পূর্ণভাবে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে থাকে। তবে সম্প্রতি ওই দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে পাকিস্তান ও চীন সীমান্ত সংক্রান্ত একটি চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করার পর তা নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে ভারত।
দুই প্রতিবেশী দেশ ‘পাকিস্তান-চীন যৌথ সীমান্ত কমিশন’ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ইসলামাবাদি এই চুক্তিকে তাদের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারের ক্ষেত্রে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবে নয়া দিল্লি তাৎক্ষণিকভাবে এই পদক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে যে, এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ভারত যে ভূখণ্ডকে নিজেদের বলে দাবি করে, সেখানে পাকিস্তান বা চীনের কোনো সীমানা তারা স্বীকার করে না।
এমন একটি সংবেদনশীল সময়ে এই ঘোষণাটি সামনে এলো, যখন ভারত ও চীন দীর্ঘদিনের সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে হিমালয় সীমান্তবর্তী প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসি) অঞ্চলে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ঠিক তখনই ভারতের অপর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ এই সীমান্তবর্তী এলাকায় তাদের সহযোগিতা নতুন করে বাড়াচ্ছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এ প্রসঙ্গে বলেন, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো বৈধ সীমান্ত নেই। আমরা তথাকথিত যৌথ কমিশনকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করছি, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
এই কমিশন মূলত পাকিস্তান-চীন সীমান্ত এলাকা এবং বিশেষ করে শাকসগাম উপত্যকাকে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রায় ৫,১৮০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই ভূখণ্ডটি ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান চীনের কাছে হস্তান্তর করেছিল, যা ভারত তার লাদাখ অঞ্চলের অংশ বলে দাবি করে আসছে।
ভারতের অবস্থান হলো, এই ভূখণ্ডটি তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য সরকারের অংশ ছিল এবং পাকিস্তান অবৈধভাবে এটি দখল করার পর অবৈধভাবে চীনের কাছে হস্তান্তর করেছে। ভারত সরকার কখনোই এই চুক্তি স্বীকার করেনি এবং এটিকে সম্পূর্ণ বেআইনি ও অকার্যকর বলে মনে করে।
ঐতিহাসিক এই প্রেক্ষাপটের কারণেই সাম্প্রতিক এই যৌথ ঘোষণার পেছনে ভারতের চরম সংবেদনশীলতা কাজ করছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, অবৈধ ও বলপূর্বক দখলে রাখা ভারতীয় ভূখণ্ড নিয়ে কোনো ধরণের চুক্তি বা সমঝোতা করার কোনো অধিকার পাকিস্তানের নেই।
অন্যদিকে, পাকিস্তান সরকারের দাবি, জম্মু ও কাশ্মীর এখনো একটি বিতর্কিত ভূখণ্ড। তাই ১৯৬৩ সালে চীনের সাথে তাদের করা সীমান্ত চুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো রাজনৈতিক বা আইনি অধিকার ভারতের নেই ও তাদের মতে এই চুক্তি পুরোপুরি বৈধ।
ভারতের শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক জাবিন টি জ্যাকব জানান, এটি একেবারেই নতুন কোনো ব্যবস্থাপনা নয়, বরং একটি পুরোনো ব্যবস্থারই পুনরুজ্জীবন।
তিনি বলেন, ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান চুক্তিতেই একটি যৌথ সীমান্ত কমিশনের বিধান রাখা হয়েছিল। এখানে একমাত্র বিষয় হলো এটি বাস্তবায়নের সময়কাল বা টাইমিং।
তিনি মনে করেন, চীন বর্তমানে তাদের সমস্ত সীমান্ত চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি পাকিস্তান সীমান্তে যখন অন্যান্য ক্ষেত্রে অস্থিরতা চলছে, তখন এই সীমান্ত দিয়ে যাতায়াত ও বিনিময়কে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্যই চীন এই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে।
অধ্যাপক জ্যাকব উল্লেখ করেন, এই ঘটনা ভারতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের। কারণ এর মাধ্যমে ১৯৬৩ সালের চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদকে অমান্য করা হয়েছে, যেখানে বলা ছিল- কাশ্মীর বিরোধ চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর ভূখণ্ডের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, তার সাথে চুক্তিটি পুনর্নবীকরণ করা হবে।
তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক তথ্যচিত্র ও গণমাধ্যমে চীনের ব্যাপক প্রভাব থাকার কারণে তারা সহজেই তাদের বয়ান ও মানচিত্র বিশ্বজুড়ে প্রচার করতে পারছে, যেখানে ভারতের প্রতিবাদ কেবল বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকছে।
তবে কৌশলগত অবস্থান ছাড়াও পাকিস্তান ও চীনের এই অঞ্চলে ইতোমধ্যে ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’ (সিপিসি) এবং কারাকোরাম হাইওয়ের মতো উন্নত অবকাঠামোগত সংযোগ ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে।
জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বর্তমানে আনোয়ার গারগাশ ডিপ্লোম্যাটিক একাডেমি এবং হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো হুসাইন হাক্কানি বিবিসিকে বলেন, এই কমিশন গঠন একই সাথে বাস্তবসম্মত এবং রাজনৈতিক কৌশলগত।
হাক্কানি জানান, এটি সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ এবং সিপিসির কৌশলগত অবকাঠামো সুরক্ষার একটি মাধ্যম। একই সাথে এটি ভারতকে দেওয়া এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা যে- বেইজিং এখনো পাকিস্তানকে সাথেই রেখেই কাশ্মীর ইস্যুকে দেখে থাকে।
তিনি আরও বলেন, ভারতে সংবিধায়িত অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের পর পাকিস্তানও বেইজিংয়ের সাথে তাদের ১৯৬৩ সালের ডি-ফ্যাক্টো বাস্তবতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কোনো বাধা দেখছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন থেকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ফেরার পরপরই এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। এর মাধ্যমে একদিকে পাকিস্তানকে তাদের সামরিক ও কৌশলগত বন্ধুত্বের নতুন আশ্বাস দেওয়া হলো, অন্যদিকে ভারতকে বার্তা দেওয়া হলো যে বহুপাক্ষিক আলোচনা হলেও দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে চীনের মূল দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে না।
তবে অধ্যাপক জ্যাকব মনে করেন, এই মুহূর্তে সীমান্তে সামরিক দিক থেকে বড় কোনো সরাসরি প্রভাব পড়বে না, তবে ভারত যে বিষয়টিকে দীর্ঘ দিন ধরে প্রত্যাখ্যান করে আসছে, তা ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জয়সোয়াল পরিষ্কার করেছেন যে, ভারতের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করে অবৈধ দখলদারিত্বকে বৈধ করার যেকোনো চেষ্টা সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নয়।
হাক্কানি পরিশেষে উল্লেখ করেন, ভারত ও চীনের সীমানা বিরোধ কেবল মানচিত্রের নয়, বরং এটি ভূ-কৌশলগত। ফলে কেবল সীমান্ত আলোচনার মাধ্যমে এই জটিলতার সমাধান সম্ভব নয়। সূত্র: বিবিসি


























