ঢাকা ০৯:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্রান্তিকাল পার করছে অর্থনীতি

  • আপডেট সময়: ০৯:০১:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১৪৩ জন দেখেছে
Spread the love

লোকসমাচার ডেস্ক:বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সূচক অনুসারে, দেশের অর্থনীতি এক ক্রান্তিকাল পার করছে। মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে আসায় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ চাঙ্গা থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কিছু স্বস্তি মিললেও, ব্যাংকিং খাতের উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং বিনিয়োগের স্থবিরতা দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। অর্থনীতিকে পূর্ণ গতিশীল করতে হলে আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গতকাল রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক অর্থনৈতিক সূচক’ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে মিশ্র ধারা বজায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে গতি ফিরলেও, ব্যাংকিং খাতের মূল চ্যালেঞ্জ-বিশেষ করে খেলাপি ঋণ এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি- অর্থনীতিবিদদের ভাবিয়ে তুলছে।

ব্যাংকিং খাত ও খেলাপি ঋণ, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ : সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যান্য সূচকে কিছু সুসংবাদ থাকলেও ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, মোট বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। জুন ২০২৬ পর্যন্ত তথ্যানুযায়ী, মোট বকেয়ার অনুপাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২.৭৮ শতাংশ (নিট খেলাপি ঋণ ১৫.২২ শতাংশ)। বিগত বছরগুলোতে এই হার অনেক কম থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এটি পাহাড়সম রূপ নিয়েছে, যা আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।

ঋণ প্রবৃদ্ধি : বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সামান্য গতি পেলেও সরকারি খাতে নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বেশ ঊর্ধ্বমুখী (৩৪.৫১ শতাংশ বৃদ্ধি জুন ২৬ এর তুলনামূলক চিত্রে), যা সরকারের বাজেট ঘাটতি মেটানোর প্রচেষ্টাকে ফুটিয়ে তোলে।

প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ চিত্র : অর্থনৈতিক মন্দাভাব এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। সংশোধিত প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৪৯ শতাংশে নেমে আসার পর ২০২৬ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৪.১৪ শতাংশে উন্নীত হওয়ার প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় সঞ্চয়পত্র খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে; যেখানে নিট বিক্রি মাইনাস বা ঋণাত্মক ধারায় (-৬০৬৩.৩৩ কোটি টাকা) অবস্থান করছে, যা নির্দেশ করে সাধারণ মানুষ সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে বাধ্য হচ্ছেন কিংবা বিকল্প বিনিয়োগের পথ বেছে নিচ্ছেন।

মূল্যস্ফীতিতে স্বস্তির সুবাতাস : দীর্ঘ দিন ধরে সাধারণ মানুষের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ানো মূল্যস্ফীতিতে এখন কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে জাতীয় মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮.২৬ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ে (আগস্ট ২০২৫) ছিল ৮.২৯ শতাংশ এবং তারও আগে মে ২০২৬-এ এটি ছিল ৯.১৬ শতাংশ। আর আগস্ট ২০২৬-এ ১২ মাসের গড়ভিত্তিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে ৮.৬৬ শতাংশে অবস্থান করছে, যা আগের বছর একই সময়ে ৯.৫৮ শতাংশ ছিল। বাজার ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি এবং সরবরাহ লাইন স্বাভাবিক হওয়ার ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে মূল্যস্ফীতির হার নিচের দিকে মানে আগের বছরের তুলনায় জীবন যাত্রার ব্যয় কমেছে এমন নয়। বরং গত বছরের তুলনায় জীবন যাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির হার কিছুটা কমেছে।

বৈদেশিক খাত ও রেমিট্যান্স : ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত : দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। জুলাই-আগস্ট (অর্থবছর ২৭) সময়ে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। শুধু জুলাই ২০২৬-এ রেমিট্যান্স বৃদ্ধির হার ছিল বেশ শক্তিশালী, আর সার্বিকভাবে এই খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি জোরালো অবস্থানে রয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চিত্র অনুসারে বিপিএম৬ ম্যানুয়াল অনুযায়ী দেশের রিজার্ভ এখন প্রায় ৩২-৩৩ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ওঠানামা করছে, যা দেশের আমদানির দায় মেটানোর ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে।

অন্য দিকে আমদানি ও রফতানি চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমদানির এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী পণ্য ও পেট্রোলিয়াম আমদানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি রয়েছে, যা দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পের জন্য ভালো লক্ষণ। তবে রফতানি আয়ে কিছু খাতের প্রবৃদ্ধিতে সামান্য নেতিবাচক বা মন্থর গতি লক্ষ্য করা গেছে।

ট্যাগ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইনফরমেশন সেভ করুন

জনপ্রিয়

দেশে ৮৮ শতাংশ পরিবার আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করছে, শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিতের আহ্বান প্রতিমন্ত্রীর

ক্রান্তিকাল পার করছে অর্থনীতি

আপডেট সময়: ০৯:০১:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Spread the love

লোকসমাচার ডেস্ক:বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সূচক অনুসারে, দেশের অর্থনীতি এক ক্রান্তিকাল পার করছে। মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে আসায় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ চাঙ্গা থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কিছু স্বস্তি মিললেও, ব্যাংকিং খাতের উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং বিনিয়োগের স্থবিরতা দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। অর্থনীতিকে পূর্ণ গতিশীল করতে হলে আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গতকাল রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক অর্থনৈতিক সূচক’ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে মিশ্র ধারা বজায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে গতি ফিরলেও, ব্যাংকিং খাতের মূল চ্যালেঞ্জ-বিশেষ করে খেলাপি ঋণ এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি- অর্থনীতিবিদদের ভাবিয়ে তুলছে।

ব্যাংকিং খাত ও খেলাপি ঋণ, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ : সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যান্য সূচকে কিছু সুসংবাদ থাকলেও ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, মোট বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। জুন ২০২৬ পর্যন্ত তথ্যানুযায়ী, মোট বকেয়ার অনুপাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২.৭৮ শতাংশ (নিট খেলাপি ঋণ ১৫.২২ শতাংশ)। বিগত বছরগুলোতে এই হার অনেক কম থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এটি পাহাড়সম রূপ নিয়েছে, যা আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।

ঋণ প্রবৃদ্ধি : বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সামান্য গতি পেলেও সরকারি খাতে নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বেশ ঊর্ধ্বমুখী (৩৪.৫১ শতাংশ বৃদ্ধি জুন ২৬ এর তুলনামূলক চিত্রে), যা সরকারের বাজেট ঘাটতি মেটানোর প্রচেষ্টাকে ফুটিয়ে তোলে।

প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ চিত্র : অর্থনৈতিক মন্দাভাব এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। সংশোধিত প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৪৯ শতাংশে নেমে আসার পর ২০২৬ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৪.১৪ শতাংশে উন্নীত হওয়ার প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় সঞ্চয়পত্র খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে; যেখানে নিট বিক্রি মাইনাস বা ঋণাত্মক ধারায় (-৬০৬৩.৩৩ কোটি টাকা) অবস্থান করছে, যা নির্দেশ করে সাধারণ মানুষ সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে বাধ্য হচ্ছেন কিংবা বিকল্প বিনিয়োগের পথ বেছে নিচ্ছেন।

মূল্যস্ফীতিতে স্বস্তির সুবাতাস : দীর্ঘ দিন ধরে সাধারণ মানুষের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ানো মূল্যস্ফীতিতে এখন কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে জাতীয় মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮.২৬ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ে (আগস্ট ২০২৫) ছিল ৮.২৯ শতাংশ এবং তারও আগে মে ২০২৬-এ এটি ছিল ৯.১৬ শতাংশ। আর আগস্ট ২০২৬-এ ১২ মাসের গড়ভিত্তিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে ৮.৬৬ শতাংশে অবস্থান করছে, যা আগের বছর একই সময়ে ৯.৫৮ শতাংশ ছিল। বাজার ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি এবং সরবরাহ লাইন স্বাভাবিক হওয়ার ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে মূল্যস্ফীতির হার নিচের দিকে মানে আগের বছরের তুলনায় জীবন যাত্রার ব্যয় কমেছে এমন নয়। বরং গত বছরের তুলনায় জীবন যাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির হার কিছুটা কমেছে।

বৈদেশিক খাত ও রেমিট্যান্স : ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত : দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। জুলাই-আগস্ট (অর্থবছর ২৭) সময়ে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। শুধু জুলাই ২০২৬-এ রেমিট্যান্স বৃদ্ধির হার ছিল বেশ শক্তিশালী, আর সার্বিকভাবে এই খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি জোরালো অবস্থানে রয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চিত্র অনুসারে বিপিএম৬ ম্যানুয়াল অনুযায়ী দেশের রিজার্ভ এখন প্রায় ৩২-৩৩ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ওঠানামা করছে, যা দেশের আমদানির দায় মেটানোর ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে।

অন্য দিকে আমদানি ও রফতানি চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমদানির এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী পণ্য ও পেট্রোলিয়াম আমদানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি রয়েছে, যা দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পের জন্য ভালো লক্ষণ। তবে রফতানি আয়ে কিছু খাতের প্রবৃদ্ধিতে সামান্য নেতিবাচক বা মন্থর গতি লক্ষ্য করা গেছে।