লোকসমাচার নিজস্ব প্রতিবেদক:জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ করা একটি অভিযোগের তদন্তকে কেন্দ্র করে ঢাকার নবাবগঞ্জ থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগের পর ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, পরবর্তীতে একজন স্থানীয় মাতব্বরের মাধ্যমে ওই টাকা ফেরত দেওয়া হলেও প্রকৃত প্রাপক—তার থানা প্রতিনিধি বা প্রতিনিধির স্ত্রী—টাকাটি বাস্তবে পেয়েছেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা, টাকা গ্রহণ ও ফেরতের প্রক্রিয়া এবং ৯৯৯-এ করা অভিযোগের সত্যতা নিয়ে একাধিক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগে একাধিক মামলা দেওয়ার চেষ্টা বা মামলা হওয়ার বিষয়টিও তদন্তের দাবি রাখে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মোঃ আলী জিন্নাহ নামে ওই অভিযোগকারী জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর প্রধান ও সার্বিক কার্যক্রমের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগে নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক সুদর্শন, তার সঙ্গে থাকা পাঁচ কনস্টেবল এবং থানার অফিসার ইনচার্জ আবু হানিফের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২৯ আগস্টের ঘটনায় তাকে পুলিশ থানায় নিয়ে যাওয়ার পর তার নিউজ পোর্টালের নবাবগঞ্জ থানা প্রতিনিধির কাছ থেকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
অভিযোগকারীর দাবি, প্রতিনিধির স্ত্রী তাকে মোবাইল ফোনে জানিয়েছিলেন—নগদ টাকা না থাকায় স্বর্ণের কানের দুল বিক্রি করে ওই টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত কথোপকথনের রেকর্ডও তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
অভিযোগের পর টাকা ফেরত—কিন্তু কার হাতে?
ঘটনাটি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে অভিযোগ দায়েরের পর। অভিযোগকারীর দাবি, পুলিশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন স্থানীয় মাতব্বরের মাধ্যমে পরে ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে তাকে জানানো হয়।
তবে অভিযোগকারীর আশঙ্কা, তার প্রতিনিধি কিংবা প্রতিনিধির স্ত্রী সরাসরি ওই টাকা পেয়েছেন কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।
অভিযোগকারীর ভাষ্য, মোবাইল ফোনে তাকে জানানো হয়েছে যে টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু টাকা ফেরত পাওয়ার দৃশ্যমান বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ, যেমন টাকা হস্তান্তরের ভিডিও, রসিদ, ব্যাংক/মোবাইল লেনদেনের তথ্য বা স্বাক্ষরযুক্ত গ্রহণপত্র তার হাতে নেই।
এ কারণে তার প্রশ্ন—টাকা যদি সত্যিই ফেরত দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে কার কাছে, কখন, কোথায় এবং কীভাবে তা ফেরত দেওয়া হয়েছে?
আরও একটি প্রশ্ন হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা তার স্ত্রী কোনো ধরনের চাপ, প্রভাব বা কৌশলের কারণে টাকা পাওয়ার কথা বলেছেন কি না। এ বিষয়টিও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে অভিযোগকারীর দাবি।
৩১ আগস্টের মুচলেকা, কিন্তু সমাধান কোথায়?
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ৩১ আগস্টের ঘটনা। অভিযোগকারীর দাবি, তার খালা ও সংশ্লিষ্ট পরিবারের একজন সদস্য নবাবগঞ্জ থানায় উপস্থিত হয়ে ৯৯৯-এ করা অভিযোগের বিষয়গুলো মিথ্যা বলে জানান এবং পাওনা টাকার বিরোধের বিষয়টি স্বীকার করেন।
পরে তারা থানায় মুচলেকা দিয়ে বাড়িতে গিয়ে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধান করার আশ্বাস দিয়ে সংশ্লিষ্টদের নিজ জিম্মায় নিয়ে যান বলে অভিযোগকারীর দাবি।
কিন্তু অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, এরপরও পাওনা টাকার বিরোধের কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি।
এখানেই উঠছে আরেকটি প্রশ্ন—থানায় মুচলেকা দিয়ে স্থানীয়ভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির আশ্বাস দেওয়ার পরও যদি তা বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে ওই মুচলেকার আইনগত ও প্রশাসনিক অবস্থান কী?
পাওনা টাকা পরিশোধ না করে অভিযোগ ও মামলার কৌশল?
আলী জিন্নাহর অভিযোগ, তার খালাতো বোন ও ভগ্নিপতির কাছে তার বিপুল পরিমাণ টাকা পাওনা রয়েছে। এ নিয়ে আদালতে মামলাও চলমান।
তার দাবি, পাওনা টাকা পরিশোধের পরিবর্তে তার বিরুদ্ধে ৯৯৯-এ গুরুতর অভিযোগ করা হয় এবং পরবর্তীতে তাকে হয়রানি করা হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর ও মিথ্যা মামলা দেওয়ার চেষ্টা বা মামলা করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর বক্তব্য হলো, এসব অভিযোগের উদ্দেশ্য ছিল মূল আর্থিক বিরোধকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়া এবং পাওনা টাকা পরিশোধের চাপ থেকে নিজেদের রক্ষা করা।
তবে ৯৯৯-এ করা অভিযোগগুলো সত্য ছিল কি না এবং পরবর্তীতে করা মামলাগুলোর ভিত্তি কতটা সত্য—তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট অভিযোগ, মামলা, জিডি, পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা জরুরি।
পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত হবে কি?
ঘটনাটিতে এখন কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে তদন্তের দাবি রাখছে—
১. ৫০ হাজার টাকা আদৌ নেওয়া হয়েছিল কি না;
২. টাকা নেওয়া হয়ে থাকলে কার নির্দেশে বা কার উপস্থিতিতে নেওয়া হয়েছিল;
৩. স্থানীয় মাতব্বরের মাধ্যমে টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি সত্য কি না;
৪. ফেরত দেওয়া হয়ে থাকলে প্রকৃত প্রাপক কে;
৫. টাকা গ্রহণের কোনো লিখিত, ভিডিও বা আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ রয়েছে কি না;
৬. প্রতিনিধির স্ত্রী স্বর্ণ বিক্রি করে টাকা দিয়েছিলেন কি না;
৭. ৯৯৯-এ করা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে পুলিশ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছিল কি না;
৮. ৩১ আগস্ট থানায় দেওয়া মুচলেকায় কী লেখা ছিল এবং তা বাস্তবে কার্যকর হয়েছে কি না;
৯. অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে করা বা করার চেষ্টা করা মামলাগুলোর অভিযোগ কতটা সত্য;
১০. পুরো ঘটনায় কোনো পক্ষ পুলিশি প্রভাব বা চাপ ব্যবহার করেছে কি না।
ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
অভিযোগকারী মোঃ আলী জিন্নাহ দাবি করেছেন, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা হোক। একই সঙ্গে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা যাচাই, টাকা ফেরতের প্রকৃত প্রাপক নির্ধারণ, ৯৯৯-এ করা অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা বা হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—নবাবগঞ্জ থানা ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষ কি অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে? নাকি ৯৯৯-এ করা অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকবে?
ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে পুলিশি নথি, ৯৯৯ কলের রেকর্ড, মুচলেকা, মামলার কাগজপত্র, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল কথোপকথন এবং টাকা নেওয়া ও ফেরতের বিষয়ে প্রত্যক্ষ প্রমাণ যাচাই করলেই এ প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলতে পারে।






















