ঢাকা ০১:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নীলফামারীতে দুর্নীতির দায়ে ফেসে যাচ্ছে যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন

  • আপডেট সময়: ০৮:১৫:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬
  • ১১৩ জন দেখেছে
Spread the love

লোকসমাচার,নীলফামারী প্রতিনিধি: নীলফামারী সদর উপজেলার যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ও গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো: আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি, অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ঘিরে দিন দিন বাড়ছে জনমনে ক্ষোভ ও অসন্তোষ। তদন্তের আশ্বাস মিললেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ লেনদেন, ভিজিএফ কার্ড নিয়ন্ত্রণ এবং প্রকল্প অনুমোদনের নামে অনৈতিকভাবে টাকা আদায় করা হয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ইউপি সদস্য ও ভুক্তভোগীদের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদের টি.আর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতি লাখ টাকায় প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বরাদ্দকৃত ভিজিএফ কর্মসূচির প্রায় ৪০০টি কার্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গোড়গ্রাম ইউনিয়নের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ইউপি সদস্যদের কাছ থেকে নিয়মিত কমিশন আদায় করা হতো। প্রকল্প অনুমোদন ও বিল ছাড়ের ক্ষেত্রেও “অঘোষিত নিয়ম” হিসেবে আর্থিক লেনদেন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন একাধিক জনপ্রতিনিধি।

সংরক্ষিত নারী সদস্য বিলকিস বেগম বলেন, আমাকে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার টাকার একটি প্রকল্প দেওয়া হয়। কাজ শেষ হলেও এখনো বিল পাইনি। প্রকল্প দেওয়ার সময় প্রশাসক স্যার অগ্রিম ৪০ হাজার টাকা নিয়েছেন। আরেক সংরক্ষিত নারী সদস্য চম্পা রানী বলেন, ২ লাখ ৬৩ হাজার টাকার প্রকল্পের বিপরীতে আমার কাছ থেকেও ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এটি নাকি প্রশাসকের প্রাপ্য বলে জানানো হয়।

ইউপি সদস্য মশিউর রহমান অভিযোগ করে বলেন, টি.আর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের জন্য প্রতি লাখে ২০ হাজার টাকা দিতে হবে বলে জানানো হয়। আমিসহ আরও কয়েকজন সদস্য টাকা দিয়েছি। এছাড়া ভিজিএফের প্রায় ৪০০টি কার্ডও তিনি নিজের কাছে রেখেছেন। গত ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার দুপুরে গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদে ইউপি সদস্য ও এলাকাবাসী প্রায় এক ঘণ্টা অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে কার্যালয়ের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখেন। ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিচালিত ১৪টি প্রশিক্ষণ ব্যাচের মধ্যে ৭ দিনের অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষণার্থীদের সরকার নির্ধারিত ৬০০ টাকা ভাতা দেওয়ার কথা থাকলেও উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন মাত্র ৫৫০ টাকা প্রদান করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ টাকা রেভিনিউ কর্তনের সুযোগ থাকলেও অতিরিক্ত অর্থ কেটে রাখা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। এছাড়াও সম্প্রতি রামগঞ্জের একটি সংগঠনের নিবন্ধনের আবেদন জেলা কার্যালয়ে প্রেরণ করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, সংগঠনটির নিজস্ব কোনো অফিস বা স্থায়ী অবকাঠামো নেই। একটি ছোট দোকান সদৃশ স্থাপনাকে অফিস দেখিয়ে উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিস থেকে নিবন্ধনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এতে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিয়মনীতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ এবং টেলিভিশনে প্রতিবেদন প্রচারের পরও এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি গঠন, প্রশাসনিক জিজ্ঞাসাবাদ বা বিভাগীয় ব্যবস্থা দৃশ্যমান হয়নি। এতে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে কি না তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোবাশ্বিরা আমাতুল্লাহ তদন্তের আশ্বাস দিলেও সেই আশ্বাস এখনো বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সদর উপজেলার যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ও গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. আলমগীর হোসেন। দুর্নীতির অভিযোগে যখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাই প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, তখন প্রশাসনের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে নীলফামারীতে।

ট্যাগ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইনফরমেশন সেভ করুন

জনপ্রিয়

দেশে ৮৮ শতাংশ পরিবার আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করছে, শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিতের আহ্বান প্রতিমন্ত্রীর

নীলফামারীতে দুর্নীতির দায়ে ফেসে যাচ্ছে যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন

আপডেট সময়: ০৮:১৫:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬
Spread the love

লোকসমাচার,নীলফামারী প্রতিনিধি: নীলফামারী সদর উপজেলার যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ও গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো: আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি, অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ঘিরে দিন দিন বাড়ছে জনমনে ক্ষোভ ও অসন্তোষ। তদন্তের আশ্বাস মিললেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ লেনদেন, ভিজিএফ কার্ড নিয়ন্ত্রণ এবং প্রকল্প অনুমোদনের নামে অনৈতিকভাবে টাকা আদায় করা হয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ইউপি সদস্য ও ভুক্তভোগীদের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদের টি.আর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতি লাখ টাকায় প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বরাদ্দকৃত ভিজিএফ কর্মসূচির প্রায় ৪০০টি কার্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গোড়গ্রাম ইউনিয়নের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ইউপি সদস্যদের কাছ থেকে নিয়মিত কমিশন আদায় করা হতো। প্রকল্প অনুমোদন ও বিল ছাড়ের ক্ষেত্রেও “অঘোষিত নিয়ম” হিসেবে আর্থিক লেনদেন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন একাধিক জনপ্রতিনিধি।

সংরক্ষিত নারী সদস্য বিলকিস বেগম বলেন, আমাকে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার টাকার একটি প্রকল্প দেওয়া হয়। কাজ শেষ হলেও এখনো বিল পাইনি। প্রকল্প দেওয়ার সময় প্রশাসক স্যার অগ্রিম ৪০ হাজার টাকা নিয়েছেন। আরেক সংরক্ষিত নারী সদস্য চম্পা রানী বলেন, ২ লাখ ৬৩ হাজার টাকার প্রকল্পের বিপরীতে আমার কাছ থেকেও ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এটি নাকি প্রশাসকের প্রাপ্য বলে জানানো হয়।

ইউপি সদস্য মশিউর রহমান অভিযোগ করে বলেন, টি.আর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের জন্য প্রতি লাখে ২০ হাজার টাকা দিতে হবে বলে জানানো হয়। আমিসহ আরও কয়েকজন সদস্য টাকা দিয়েছি। এছাড়া ভিজিএফের প্রায় ৪০০টি কার্ডও তিনি নিজের কাছে রেখেছেন। গত ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার দুপুরে গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদে ইউপি সদস্য ও এলাকাবাসী প্রায় এক ঘণ্টা অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে কার্যালয়ের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখেন। ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিচালিত ১৪টি প্রশিক্ষণ ব্যাচের মধ্যে ৭ দিনের অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষণার্থীদের সরকার নির্ধারিত ৬০০ টাকা ভাতা দেওয়ার কথা থাকলেও উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন মাত্র ৫৫০ টাকা প্রদান করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ টাকা রেভিনিউ কর্তনের সুযোগ থাকলেও অতিরিক্ত অর্থ কেটে রাখা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। এছাড়াও সম্প্রতি রামগঞ্জের একটি সংগঠনের নিবন্ধনের আবেদন জেলা কার্যালয়ে প্রেরণ করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, সংগঠনটির নিজস্ব কোনো অফিস বা স্থায়ী অবকাঠামো নেই। একটি ছোট দোকান সদৃশ স্থাপনাকে অফিস দেখিয়ে উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিস থেকে নিবন্ধনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এতে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিয়মনীতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ এবং টেলিভিশনে প্রতিবেদন প্রচারের পরও এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি গঠন, প্রশাসনিক জিজ্ঞাসাবাদ বা বিভাগীয় ব্যবস্থা দৃশ্যমান হয়নি। এতে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে কি না তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোবাশ্বিরা আমাতুল্লাহ তদন্তের আশ্বাস দিলেও সেই আশ্বাস এখনো বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সদর উপজেলার যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ও গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. আলমগীর হোসেন। দুর্নীতির অভিযোগে যখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাই প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, তখন প্রশাসনের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে নীলফামারীতে।