ঢাকা ১১:১২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাকিস্তানের জলাশয়ে আগ্রাসী ‘এলিয়েন’ মাছ, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

  • আপডেট সময়: ০৮:০৩:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২১১ জন দেখেছে
Spread the love

লোক সমাচার ডেস্ক:ডব্লিউডব্লিউএফ-পাকিস্তান সতর্ক করেছে যে, পাকিস্তানের সিন্ধু ও দক্ষিণ পাঞ্জাবের জলাশয়ে একটি আগ্রাসী ‘এলিয়েন’ মাছের প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে। এটা জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য অর্থনীতির জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। এক বিবৃতিতে পরিবেশ বিষয়ক এই সংস্থাটি জানায়, ৪ঠা জানুয়ারি সুক্কুরের কাছে এক ধান্দ (অগভীর জলাশয়) থেকে একটি অচেনা মাছ করাচি ফিশ হারবারে আনা হয়। কেউ এটিকে শনাক্ত করতে না পারায় মাছটিকে ‘এলিয়েন’ বা আগন্তুক প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরে জানা যায়, মাছটি হলো অ্যামাজন সেইলফিন ক্যাটফিশ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন জিও নিউজ।

বিবৃতিতে বলা হয়, মোটা, শক্ত বর্মের মতো হাড়ের প্লেটে ঢাকা শরীরের এই মাছটি একটি এলিয়েন প্রজাতি, যা দুর্ঘটনাবশত প্রাকৃতিক জলাশয়ে প্রবেশ করেছে এবং এখন এটি সিন্ধু ও দক্ষিণ পাঞ্জাব অঞ্চলে পাওয়া যাচ্ছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অ্যামাজন সেইলফিন ক্যাটফিশ মূলত লাতিন আমেরিকার স্বদেশি প্রজাতি এবং সারা বিশ্বে অ্যাকোয়ারিয়াম মাছ হিসেবে খুব জনপ্রিয়। এটি অত্যন্ত সফল আক্রমণাত্মক প্রজাতি হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তানে এখন এ মাছটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই একে নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ করা কার্যত অসম্ভব। সংস্থাটি জানায়, এই মাছ পাকিস্তানে প্রবর্তিত ২৬টি আক্রমণাত্মক এলিয়েন মাছের একটি- যেগুলো দুর্ঘটনাবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে আনা হয়েছিল, পরে বিস্তার লাভ করে দেশটির জলজ জীব জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্যকে হুমকিতে ফেলেছে।

ডব্লিউডব্লিউএফ-পাকিস্তান জানায়, আক্রমণাত্মক মাছের প্রজাতি স্থানীয় প্রজাতির খাদ্য ও জায়গার প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে, শিকার করে, রোগ ছড়িয়ে এবং আবাসস্থল বদলে দিয়ে জলজ বাস্তুতন্ত্রকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে। এর ফলে জীববৈচিত্র্য হ্রাস, মৎস্যখাতে অর্থনৈতিক ক্ষতি, এমনকি বাস্তুতন্ত্র ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়; পানির ঘোলাভাব বাড়ে, স্থানীয় প্রজাতি বিলুপ্ত হয়, আর বাণিজ্যিক মাছ আহরণে বড় ধরনের ক্ষতি ঘটে।

সংস্থাটি আরও জানায় নদী, খাল-বিল ও হ্রদসহ প্রাকৃতিক জলাশয়ের নাজুক বাস্তুতন্ত্রের জন্য এসব আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত। পাকিস্তানের খাইবার পখতুনখাওয়া অঞ্চলে ১৯২৮ সালে প্রথম আনা হয় ব্রাউন ট্রাউট ও রেইনবো ট্রাউট- যা ছিল দেশের প্রথম দিকের বহিরাগত মাছের প্রজাতি। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি ও জলজ আগাছা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ১৯৬০-এর দশকে মোজাম্বিক তেলাপিয়া, কমন কার্প, গোল্ডফিশ ও গ্রাস কার্প আনা হয়। কিন্তু এই সব প্রজাতিই পরে আক্রমণাত্মক হয়ে স্থানীয় মাছের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

১৯৮০-এর দশকে সিলভার কার্প, বিগহেড কার্প, নীল তেলাপিয়া ও ব্লু তেলাপিয়া আনা হয়। গ্রাস কার্প পুনরায় প্রবর্তিত হয়। এসব প্রজাতি এখন প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষত ১৯৬০-এর দশকে তেলাপিয়া প্রবর্তনের ফলে উষ্ণ পানির জলাশয়ে স্থানীয় মাছের আংশিক বা পুরো বিলুপ্তি ঘটেছে। ফলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জলাশয় থেকে বাণিজ্যিক মাছ প্রায় হারিয়ে গেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, মানচার ও কিঝর হ্রদে তেলাপিয়ার ব্যাপক বংশবৃদ্ধি ও দ্রুত বৃদ্ধি মাছ উৎপাদনকে ভয়াবহভাবে কমিয়ে দিয়েছে, যা এলাকার জেলেদের ওপর গুরুতর সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলেছে।

গত ৩০ বছরে উত্তর আফ্রিকান ক্যাটফিশ, ওয়াকিং ক্যাটফিশ, মাগুর ক্যাটফিশ, ব্লান্টু-টুথড আফ্রিকান ক্যাটফিশ ও চ্যানেল ক্যাটফিশসহ একাধিক প্রজাতি পাকিস্তানে আনা হয়েছে। এগুলো এখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং স্থানীয় মাছের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। মাছ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত প্রবর্তনের পাশাপাশি অ্যামাজন সেইলফিন ক্যাটফিশ, গাপি ও মলি’র মতো অনেক প্রজাতি অ্যাকোয়ারিয়াম ব্যবসায় অব্যবস্থাপনার কারণে প্রাকৃতিক জলাশয়ে ঢুকে পড়েছে। সংস্থাটি বলেছে, এসব মাছ পাকিস্তানের শহর ও নগরঘেঁষা প্রাকৃতিক জলাশয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করছে।

ট্যাগ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইনফরমেশন সেভ করুন

জনপ্রিয়

দেশে ৮৮ শতাংশ পরিবার আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করছে, শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিতের আহ্বান প্রতিমন্ত্রীর

পাকিস্তানের জলাশয়ে আগ্রাসী ‘এলিয়েন’ মাছ, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

আপডেট সময়: ০৮:০৩:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬
Spread the love

লোক সমাচার ডেস্ক:ডব্লিউডব্লিউএফ-পাকিস্তান সতর্ক করেছে যে, পাকিস্তানের সিন্ধু ও দক্ষিণ পাঞ্জাবের জলাশয়ে একটি আগ্রাসী ‘এলিয়েন’ মাছের প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে। এটা জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য অর্থনীতির জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। এক বিবৃতিতে পরিবেশ বিষয়ক এই সংস্থাটি জানায়, ৪ঠা জানুয়ারি সুক্কুরের কাছে এক ধান্দ (অগভীর জলাশয়) থেকে একটি অচেনা মাছ করাচি ফিশ হারবারে আনা হয়। কেউ এটিকে শনাক্ত করতে না পারায় মাছটিকে ‘এলিয়েন’ বা আগন্তুক প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরে জানা যায়, মাছটি হলো অ্যামাজন সেইলফিন ক্যাটফিশ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন জিও নিউজ।

বিবৃতিতে বলা হয়, মোটা, শক্ত বর্মের মতো হাড়ের প্লেটে ঢাকা শরীরের এই মাছটি একটি এলিয়েন প্রজাতি, যা দুর্ঘটনাবশত প্রাকৃতিক জলাশয়ে প্রবেশ করেছে এবং এখন এটি সিন্ধু ও দক্ষিণ পাঞ্জাব অঞ্চলে পাওয়া যাচ্ছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অ্যামাজন সেইলফিন ক্যাটফিশ মূলত লাতিন আমেরিকার স্বদেশি প্রজাতি এবং সারা বিশ্বে অ্যাকোয়ারিয়াম মাছ হিসেবে খুব জনপ্রিয়। এটি অত্যন্ত সফল আক্রমণাত্মক প্রজাতি হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তানে এখন এ মাছটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই একে নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ করা কার্যত অসম্ভব। সংস্থাটি জানায়, এই মাছ পাকিস্তানে প্রবর্তিত ২৬টি আক্রমণাত্মক এলিয়েন মাছের একটি- যেগুলো দুর্ঘটনাবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে আনা হয়েছিল, পরে বিস্তার লাভ করে দেশটির জলজ জীব জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্যকে হুমকিতে ফেলেছে।

ডব্লিউডব্লিউএফ-পাকিস্তান জানায়, আক্রমণাত্মক মাছের প্রজাতি স্থানীয় প্রজাতির খাদ্য ও জায়গার প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে, শিকার করে, রোগ ছড়িয়ে এবং আবাসস্থল বদলে দিয়ে জলজ বাস্তুতন্ত্রকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে। এর ফলে জীববৈচিত্র্য হ্রাস, মৎস্যখাতে অর্থনৈতিক ক্ষতি, এমনকি বাস্তুতন্ত্র ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়; পানির ঘোলাভাব বাড়ে, স্থানীয় প্রজাতি বিলুপ্ত হয়, আর বাণিজ্যিক মাছ আহরণে বড় ধরনের ক্ষতি ঘটে।

সংস্থাটি আরও জানায় নদী, খাল-বিল ও হ্রদসহ প্রাকৃতিক জলাশয়ের নাজুক বাস্তুতন্ত্রের জন্য এসব আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত। পাকিস্তানের খাইবার পখতুনখাওয়া অঞ্চলে ১৯২৮ সালে প্রথম আনা হয় ব্রাউন ট্রাউট ও রেইনবো ট্রাউট- যা ছিল দেশের প্রথম দিকের বহিরাগত মাছের প্রজাতি। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি ও জলজ আগাছা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ১৯৬০-এর দশকে মোজাম্বিক তেলাপিয়া, কমন কার্প, গোল্ডফিশ ও গ্রাস কার্প আনা হয়। কিন্তু এই সব প্রজাতিই পরে আক্রমণাত্মক হয়ে স্থানীয় মাছের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

১৯৮০-এর দশকে সিলভার কার্প, বিগহেড কার্প, নীল তেলাপিয়া ও ব্লু তেলাপিয়া আনা হয়। গ্রাস কার্প পুনরায় প্রবর্তিত হয়। এসব প্রজাতি এখন প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষত ১৯৬০-এর দশকে তেলাপিয়া প্রবর্তনের ফলে উষ্ণ পানির জলাশয়ে স্থানীয় মাছের আংশিক বা পুরো বিলুপ্তি ঘটেছে। ফলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জলাশয় থেকে বাণিজ্যিক মাছ প্রায় হারিয়ে গেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, মানচার ও কিঝর হ্রদে তেলাপিয়ার ব্যাপক বংশবৃদ্ধি ও দ্রুত বৃদ্ধি মাছ উৎপাদনকে ভয়াবহভাবে কমিয়ে দিয়েছে, যা এলাকার জেলেদের ওপর গুরুতর সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলেছে।

গত ৩০ বছরে উত্তর আফ্রিকান ক্যাটফিশ, ওয়াকিং ক্যাটফিশ, মাগুর ক্যাটফিশ, ব্লান্টু-টুথড আফ্রিকান ক্যাটফিশ ও চ্যানেল ক্যাটফিশসহ একাধিক প্রজাতি পাকিস্তানে আনা হয়েছে। এগুলো এখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং স্থানীয় মাছের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। মাছ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত প্রবর্তনের পাশাপাশি অ্যামাজন সেইলফিন ক্যাটফিশ, গাপি ও মলি’র মতো অনেক প্রজাতি অ্যাকোয়ারিয়াম ব্যবসায় অব্যবস্থাপনার কারণে প্রাকৃতিক জলাশয়ে ঢুকে পড়েছে। সংস্থাটি বলেছে, এসব মাছ পাকিস্তানের শহর ও নগরঘেঁষা প্রাকৃতিক জলাশয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করছে।