ঢাকা ১২:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কি অপরাধ? বৈষম্য ও শ্রেণিবিভাজনের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন

  • আপডেট সময়: ১১:২৭:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
  • ১৪ জন দেখেছে
Spread the love

লোকসমাচার,নিজস্ব প্রতিবেদক:শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সামাজিক মর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। তিনি BSVCFICA কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি। সম্প্রতি শ্রমিকদের বেতন ও অধিকার নিয়ে দেশের শিল্প ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্ন বক্তব্য সামনে আসার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, উচ্চবর্ণের মানসিকতা ও শ্রেণিবৈষম্যনির্ভর সমাজব্যবস্থার ধারক-বাহক এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তিরা কি নিপীড়িত শ্রমিকদের যৌক্তিক বক্তব্যের জবাব দিতে পারবেন? সম্প্রতি একজন শিল্পপতি গণমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অনৈতিক খাতে অর্থ ব্যয় করতে না হলে শ্রমিকদের ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা বেতন দেওয়া অসম্ভব নয়। অন্যদিকে, কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা প্রশ্ন তুলেছেন, শ্রমিকরা কি অফিসারদের সমান বেতন চান? এসব বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে।

রাষ্ট্রের সংবিধানে কর্মজীবী মানুষের মর্যাদা নির্ধারণে অফিসার ও কর্মচারীর মধ্যে কোনো শ্রেণিগত বৈষম্যের স্বীকৃতি নেই। পদমর্যাদা, দায়িত্ব ও যোগ্যতার পার্থক্য থাকতে পারে, বেতনের ক্ষেত্রেও পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পার্থক্য কখনোই মানুষের মর্যাদা, শ্রমের মূল্য কিংবা ন্যায্য অধিকারকে খাটো করার অজুহাত হতে পারে না। বেতন নির্ধারণ হওয়া উচিত কাজের ধরন, দায়িত্ব, দক্ষতা, যোগ্যতা, শ্রমের পরিমাণ ও উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে; গায়ের রং, সামাজিক অবস্থান কিংবা তথাকথিত শ্রেণিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে অধিক শ্রমসাধ্য, ঝুঁকিপূর্ণ ও বিশেষ দক্ষতানির্ভর কাজের জন্য তুলনামূলক বেশি পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।

সেখানে শ্রমের মর্যাদাকে শ্রেণিগত অহংকার দিয়ে বিচার করা হয় না। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম লক্ষ্য ছিল শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটিয়ে ন্যায়ভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৭২ সালের সংবিধানে সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সাম্য এবং মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কিন্তু উপনিবেশিক মানসিকতা ও শ্রেণিবিভক্ত প্রশাসনিক সংস্কৃতির প্রভাবে শ্রমজীবী, কর্মজীবী ও পেশাজীবী মানুষের মধ্যে মর্যাদাগত বিভাজন এখনো দৃশ্যমান। একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও অগ্রগতির পেছনে শ্রমিক থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা প্রত্যেকেরই অবদান রয়েছে। অথচ শ্রমের মূল্যায়ন, সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বৈষম্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। গণতন্ত্রের কথা বলে ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষার রাজনীতি আর কত দিন চলবে—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু মহলের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে সম্পদ আহরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের অধিকার উপেক্ষার অভিযোগ রয়েছে। একটি স্বাধীন দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার উপেক্ষা করে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য হলো, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি কোনো বিশেষ শ্রেণির বিরুদ্ধে আন্দোলন নয়; বরং এটি মানবিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও সরকারের সমন্বয়ে কার্যকর ত্রিপক্ষীয় আলোচনা জরুরি। আলোচনার ভিত্তিতে শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি বিবেচনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিল্পকারখানার উৎপাদন এবং কর্মপরিবেশ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়বে এবং ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বারবার ফিরে আসবে।

মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং সাংবিধানিক অঙ্গীকারের বিষয়। জয় হোক শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের, জয় হোক সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের, জয় হোক শ্রমজীবী ও গণমানুষের।

ট্যাগ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইনফরমেশন সেভ করুন

জনপ্রিয়

ভুটানের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার ড্র, সেমিফাইনালে বাংলাদেশ

শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কি অপরাধ? বৈষম্য ও শ্রেণিবিভাজনের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন

আপডেট সময়: ১১:২৭:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
Spread the love

লোকসমাচার,নিজস্ব প্রতিবেদক:শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সামাজিক মর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। তিনি BSVCFICA কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি। সম্প্রতি শ্রমিকদের বেতন ও অধিকার নিয়ে দেশের শিল্প ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্ন বক্তব্য সামনে আসার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, উচ্চবর্ণের মানসিকতা ও শ্রেণিবৈষম্যনির্ভর সমাজব্যবস্থার ধারক-বাহক এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তিরা কি নিপীড়িত শ্রমিকদের যৌক্তিক বক্তব্যের জবাব দিতে পারবেন? সম্প্রতি একজন শিল্পপতি গণমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অনৈতিক খাতে অর্থ ব্যয় করতে না হলে শ্রমিকদের ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা বেতন দেওয়া অসম্ভব নয়। অন্যদিকে, কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা প্রশ্ন তুলেছেন, শ্রমিকরা কি অফিসারদের সমান বেতন চান? এসব বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে।

রাষ্ট্রের সংবিধানে কর্মজীবী মানুষের মর্যাদা নির্ধারণে অফিসার ও কর্মচারীর মধ্যে কোনো শ্রেণিগত বৈষম্যের স্বীকৃতি নেই। পদমর্যাদা, দায়িত্ব ও যোগ্যতার পার্থক্য থাকতে পারে, বেতনের ক্ষেত্রেও পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পার্থক্য কখনোই মানুষের মর্যাদা, শ্রমের মূল্য কিংবা ন্যায্য অধিকারকে খাটো করার অজুহাত হতে পারে না। বেতন নির্ধারণ হওয়া উচিত কাজের ধরন, দায়িত্ব, দক্ষতা, যোগ্যতা, শ্রমের পরিমাণ ও উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে; গায়ের রং, সামাজিক অবস্থান কিংবা তথাকথিত শ্রেণিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে অধিক শ্রমসাধ্য, ঝুঁকিপূর্ণ ও বিশেষ দক্ষতানির্ভর কাজের জন্য তুলনামূলক বেশি পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।

সেখানে শ্রমের মর্যাদাকে শ্রেণিগত অহংকার দিয়ে বিচার করা হয় না। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম লক্ষ্য ছিল শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটিয়ে ন্যায়ভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৭২ সালের সংবিধানে সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সাম্য এবং মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কিন্তু উপনিবেশিক মানসিকতা ও শ্রেণিবিভক্ত প্রশাসনিক সংস্কৃতির প্রভাবে শ্রমজীবী, কর্মজীবী ও পেশাজীবী মানুষের মধ্যে মর্যাদাগত বিভাজন এখনো দৃশ্যমান। একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও অগ্রগতির পেছনে শ্রমিক থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা প্রত্যেকেরই অবদান রয়েছে। অথচ শ্রমের মূল্যায়ন, সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বৈষম্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। গণতন্ত্রের কথা বলে ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষার রাজনীতি আর কত দিন চলবে—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু মহলের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে সম্পদ আহরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের অধিকার উপেক্ষার অভিযোগ রয়েছে। একটি স্বাধীন দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার উপেক্ষা করে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য হলো, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি কোনো বিশেষ শ্রেণির বিরুদ্ধে আন্দোলন নয়; বরং এটি মানবিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও সরকারের সমন্বয়ে কার্যকর ত্রিপক্ষীয় আলোচনা জরুরি। আলোচনার ভিত্তিতে শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি বিবেচনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিল্পকারখানার উৎপাদন এবং কর্মপরিবেশ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়বে এবং ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বারবার ফিরে আসবে।

মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং সাংবিধানিক অঙ্গীকারের বিষয়। জয় হোক শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের, জয় হোক সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের, জয় হোক শ্রমজীবী ও গণমানুষের।