ঢাকা ১০:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘মাঠের রাজনীতিতে উধাও’ সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব মণিরামপুরের আওয়ামী লীগ

  • আপডেট সময়: ১০:১২:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
  • ১৪ জন দেখেছে
Spread the love

লোকসমাচার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সুমন চক্রবর্তী:নানাভাবে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগ। পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর তার দল আওয়ামী লীগ মাঠের রাজনীতিতে একেবারে নীরব হয়ে গেলেও সরব হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। দলটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের পাশাপাশি টেলিগ্রাম চ্যানেল, এক্স (সাবেক টুইটার), ইউটিউবে প্রতিনিয়ত তথ্যমূলক ভিডিও আপলোড করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভিনদেশীয় একটি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে সেখান থেকেও আপডেট জানানো হচ্ছে।

সম্প্রতি দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ফেসবুক পেজ, এক্স (টুইটার)অ্যাকাউন্ট, টেলিগ্রাম চ্যানেল এবং ইউটিউব চ্যানেলের লিংক শেয়ার করে জানানো হয়, এসব সামাজিক মাধ্যমে এখন থেকে নিয়মিত তথ্য আপডেট দেওয়া হবে।
পাশাপাশি একটি বিদেশি নম্বরকে (+1(917)5699327) দলের অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট উল্লেখ করে সেখানে দলীয় সব খবর এবং তথ্য পাঠাতে অনুরোধ করে দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে নোটিশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগের ওই অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ মাধ্যমের বাইরে আওয়ামী লীগের প্যাডে বা অন্য কোনও মাধ্যমে বক্তব্য-বিবৃতি এলে তাতে বিভ্রান্ত না হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

ভেরিফায়েড ফেসবুকসহ আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত কয়েকদিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিনিয়তই এসব মাধ্যমে পোস্ট, ফটোকার্ড, ভিডিও, বার্তা আপলোড দেওয়া হচ্ছে।
দলের নেতাকর্মী ও গণমাধ্যমকে উদ্দেশ্য করে নানা নির্দেশনা ও বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, অগ্নিকাণ্ড, ভাঙচুরের আপডেট দেওয়া হচ্ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতিবাচক এবং আওয়ামী লীগের ইতিবাচক নানা খবরও শেয়ার করা হচ্ছে।

এছাড়া নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কিংবা অন্য সোর্সে পাওয়া নানা ভিডিওচিত্র আপলোড করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সম্প্রতি ফেসবুক পেজ থেকে দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি, বাড়িঘর ভাঙচুরের বিষয়ে থানায় অভিযোগ দায়ের বা জিডি করা এবং সেনাক্যাম্পে গিয়ে অভিযোগ দায়েরের পরামর্শও পর্যন্ত দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনও ‘অপপ্রচার’ হলে বা দলের নামে বা প্যাডে কোনও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার হলেও সেটারও ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে এসব মাধ্যম থেকে।
সোশ্যাল মিডিয়া পর্যালোচনা করে দেখা গিয়েছে, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নিজেও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে দেশে-বিদেশে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ফোন করে নানা পরামর্শ ও নির্দেশনা দিচ্ছেন। তিনি ভারতে যাওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যে দেশে বিভিন্নজনকে ফোন দিয়ে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালনের আহ্বানও জানান। তিনি এখনও এটি অব্যাহত রেখেছেন বলে তাদের দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
অবশ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একাধিক কথোপকথন ফাঁস হওয়া এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার হওয়ার প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা সতর্কতার সঙ্গে কথা বলছেন; এমন একাধিক নেতা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তারা বলেছেন, শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশে অবস্থানকারী নেতাকর্মীদের সঙ্গে খুব কমই কথা বলছেন। বিদেশে দলের যেসব নেতাকর্মী রয়েছেন তাদের সঙ্গে কম-বেশি যোগাযোগ করে নানা নির্দেশনা দিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তাদের দলীয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, এমপি-সাবেক এমপি ও দলীয় নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে চলে গেছেন। অনেকে দেশ ছেড়েছেন। আবার অনেকেই দেশে থেকেও প্রকাশ্যে আসছেন না। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়েছেন এসব নেতাকর্মীরা। মণিরামপুরে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আওয়ামী নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা বেড়েছে এবং নিজেদের অবস্থান জানাতে মণিরামপুর আওয়ামী লীগের উপজেলা কার্যালয়ে দলীয় পোস্টার লাগাতেও দেখা গেছে এবং রাজগন্জ ডিগ্রী কলেজের ছাত্রলীগের কর্মীদের জয় বাংলা স্লোগান দিতে দেখা গেছে। এসমস্ত ঘটনা একাধিক ফেসবুক আইডি থেকে শেয়ার ও পোস্ট করা হয়েছে। আর মন্তব্যের ঝড় উঠেছে নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মণিরামপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রমেশ দেবনাথের পোস্টে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী আওয়ামী নেতা স্বপন ভট্টাচার্য, তার ভাগ্নে যুবলীগের মণিরামপুর উপজেলা শাখার আহবায়ক ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান উত্তম চক্রবর্তী বাচ্চুদের রাজনৈতিক সিন্ডিকেট সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছুটা নিরব হলেও ৫ই আগস্টের পর থেকেই প্রকাশ্যে রয়েছেন তাদের একান্ত অনুসারী দ্বিতীয় প্রতিমন্ত্রী আখ্যায়িত মণিরামপুর বাজার বণিক সমিতি এবং উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতিসহ একাধিক মন্দির ও মহাশ্মশানের দায়িত্ব থেকে শুধু নিজের উন্নয়নের কারিগর তুলসী বসু সহ একাধিক ক্লিং ইমেজের বেশ কিছু নেতাকর্মীরা। অর্থ আর স্বার্থ যেন রাজনীতির একটা নৈমিত্তিক ব্যাপার।

আলোচনার শীর্ষে প্রায় সময়ই থাকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সিআইপি (এনআরবি), আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ও ৫ই আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত সংসদ সদস্য এসএম ইয়াকুব আলী ও তার অনুসারীরা। ইয়াকুব আলীর একাধিক অনুসারীরা নিয়মিত তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বিশেষ দিনে শুভেচ্ছা/শোকবার্তা জানালেও লিখেছেন না আওয়ামী লীগের পদবী, শুধুই লিখছেন সাবেক সংসদ সদস্য। ইতিমধ্যে তিনি তার অনুসারীদের গোপনে অর্থনৈতিক সুবিধাও দিচ্ছেন বলে দেখা গিয়েছে। সবথেকে আশ্চর্যজনক জনক ব্যাপার ইয়াকুব আলীর অর্থের বিনিময়ে স্থানীয় কিছু সুপরিচিত ফেসবুক পেজেও বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন, এতে করে অবশ্যই ফেসবুক পেজ এডমিনের সাথে তার যোগাযোগ ও বিজ্ঞাপন কেন্দ্রিক লেনদেন হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছেন মুলধারার সাংবাদিকেরা।
যেহেতু আওয়ামী লীগের কোন নেতা এখনও পর্যন্ত কোন প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে পারেনি বা কতৃপক্ষ নেয়নি সেহেতু এই স্থানীয় সম্পূর্ণ অবৈধ ফেসবুক পেজ ও এডমিনদের আওয়ামীপন্থী মনোভাবই এর মুল কারণ। যশোরের নিয়মিত প্রিন্ট পত্রিকায় বিশেষ দিনের বিজ্ঞাপন প্রদানকারী আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের ভরসা এখন ওয়েবসাইট ব্যতিত তথ্যমন্ত্রণালয়ের পরিপন্থী সম্পূর্ণ অবৈধ ফেসবুক পেজ।
মণিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ অধ্যক্ষ কাজী মাহামুদুল হাসান ও প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক মোঃ ফারুক হোসেনের সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন কার্যক্রম না পাওয়া গেলেও থেমে নেই মণিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের আরেক প্রভাবশালী নেতা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন লাভলু ও তার অনুসারীরা। আমজাদ হোসেন লাভলু নিজে এবং তার পরিবার ও তার অনুসারীদের ফেসবুক আইডি থেকেও চলছে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা ও রাজনৈতিক বিভিন্ন পর্যালোচনা।
পলাতক থেকেও ক্লিন ইমেজের মধ্যে থেকে সরব রয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রীর একনিষ্ঠ সহচর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা এ্যাড: বশির আহমেদ, ৫ই আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও ছাত্রলীগ থেকে উঠে আসা আওয়ামী লীগ নেতা সন্দীপ ঘোষ, যশোর-৫ মণিরামপুর আসন থেকে বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য দেশের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব মরহুম এ্যাড: খান টিপু সুলতানের ছেলে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হুমায়ুন সুলতান সাদাব, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য সহ বেশ কিছু হেভিওয়েট নেতাদের।
প্রকাশ্যে থেকে আইনগত সহায়তা প্রদানের দৃশ্য দেখা গিয়েছে উপজেলার দূর্বাডাঙ্গা ইউনিয়নের সন্তান যশোর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি এ্যাড: আলমগীর হোসেনকে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের আটক হওয়া একাধিক নেতাদের আইনগত সহায়তা দিচ্ছেন তিনি। যার চিত্র নিজের ফেসবুক আইডিতে তিনি নিয়মিত পোস্ট করছেন।
উপজেলা পর্যায়ে মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রীদের মধ্যে সরব রয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নাজমা খানম, সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান কাজী জলি আক্তার। প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছে মহিলা লীগ নেত্রী সুরাইয়া আক্তার ডেইজি ও মাজেদা বেগমসহ বেশ কিছু নেত্রীদের। পৌর কাউন্সিলর, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ মার্কামারা অধিকাংশ আওয়ামী লীগের নেতারা পলাতক হলেও নিজ নিজ ফেসবুক আইডি থেকে নিয়মিত দলীয় স্ট্যাটাস দিতে দেখা গেছে বেশ কয়েকজনকে। দুঃখজনক হলেও সত্যি ‘বর্তমানে ক্ষমতায় না থেকেও চলছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের গ্রুপিংয়ের রাজনীতি।

উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম সাইবার স্পেসসহ যেকোনো মাধ্যমে নিষিদ্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দল ও এর নেতাদের বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির পক্ষে যেকোনো ধরনের প্রচারণা বা সংবাদ প্রকাশ আইনত নিষিদ্ধ।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিভিন্ন বৈশ্বিক সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে দলের কর্মী ও সমর্থকরা নানা ধরনের মতাদর্শ ও প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা নিয়ে নানা বিতর্ক ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনা রয়েছে।

অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আওয়ামী লীগ সংক্রান্ত বিভিন্ন খবর এবং ভুয়া তথ্য (মিস-ইনফরমেশন) প্রতিরোধে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর সতর্কতা ও নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেশের অভ্যন্তরে পলাতক থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চিহ্নিত করে আটক করাও হচ্ছে।
যেহেতু প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় দলটির অফিসিয়াল বা অনানুষ্ঠানিক কার্যক্রম শেয়ার করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সারাদেশের ন্যায় যশোর জেলার মণিরামপুর উপজেলার অধিকাংশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে থেকে হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন এবং স্থানীয় নির্বাচনে এরা প্রভাব বিস্তার করতে পারেন বলেও মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ইতিমধ্যে তথ্য এসেছে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাদের বর্তমান রাজনৈতিক মহলের সাথে আতাতের নানান ঘটনা। আগামীতে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।

ট্যাগ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইনফরমেশন সেভ করুন

জনপ্রিয়

বাবার লাশ বাড়িতে রেখে পরীক্ষায় অংশ নিলেন মেয়ে

‘মাঠের রাজনীতিতে উধাও’ সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব মণিরামপুরের আওয়ামী লীগ

আপডেট সময়: ১০:১২:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
Spread the love

লোকসমাচার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সুমন চক্রবর্তী:নানাভাবে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগ। পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর তার দল আওয়ামী লীগ মাঠের রাজনীতিতে একেবারে নীরব হয়ে গেলেও সরব হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। দলটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের পাশাপাশি টেলিগ্রাম চ্যানেল, এক্স (সাবেক টুইটার), ইউটিউবে প্রতিনিয়ত তথ্যমূলক ভিডিও আপলোড করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভিনদেশীয় একটি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে সেখান থেকেও আপডেট জানানো হচ্ছে।

সম্প্রতি দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ফেসবুক পেজ, এক্স (টুইটার)অ্যাকাউন্ট, টেলিগ্রাম চ্যানেল এবং ইউটিউব চ্যানেলের লিংক শেয়ার করে জানানো হয়, এসব সামাজিক মাধ্যমে এখন থেকে নিয়মিত তথ্য আপডেট দেওয়া হবে।
পাশাপাশি একটি বিদেশি নম্বরকে (+1(917)5699327) দলের অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট উল্লেখ করে সেখানে দলীয় সব খবর এবং তথ্য পাঠাতে অনুরোধ করে দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে নোটিশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগের ওই অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ মাধ্যমের বাইরে আওয়ামী লীগের প্যাডে বা অন্য কোনও মাধ্যমে বক্তব্য-বিবৃতি এলে তাতে বিভ্রান্ত না হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

ভেরিফায়েড ফেসবুকসহ আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত কয়েকদিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিনিয়তই এসব মাধ্যমে পোস্ট, ফটোকার্ড, ভিডিও, বার্তা আপলোড দেওয়া হচ্ছে।
দলের নেতাকর্মী ও গণমাধ্যমকে উদ্দেশ্য করে নানা নির্দেশনা ও বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, অগ্নিকাণ্ড, ভাঙচুরের আপডেট দেওয়া হচ্ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতিবাচক এবং আওয়ামী লীগের ইতিবাচক নানা খবরও শেয়ার করা হচ্ছে।

এছাড়া নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কিংবা অন্য সোর্সে পাওয়া নানা ভিডিওচিত্র আপলোড করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সম্প্রতি ফেসবুক পেজ থেকে দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি, বাড়িঘর ভাঙচুরের বিষয়ে থানায় অভিযোগ দায়ের বা জিডি করা এবং সেনাক্যাম্পে গিয়ে অভিযোগ দায়েরের পরামর্শও পর্যন্ত দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনও ‘অপপ্রচার’ হলে বা দলের নামে বা প্যাডে কোনও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার হলেও সেটারও ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে এসব মাধ্যম থেকে।
সোশ্যাল মিডিয়া পর্যালোচনা করে দেখা গিয়েছে, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নিজেও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে দেশে-বিদেশে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ফোন করে নানা পরামর্শ ও নির্দেশনা দিচ্ছেন। তিনি ভারতে যাওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যে দেশে বিভিন্নজনকে ফোন দিয়ে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালনের আহ্বানও জানান। তিনি এখনও এটি অব্যাহত রেখেছেন বলে তাদের দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
অবশ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একাধিক কথোপকথন ফাঁস হওয়া এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার হওয়ার প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা সতর্কতার সঙ্গে কথা বলছেন; এমন একাধিক নেতা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তারা বলেছেন, শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশে অবস্থানকারী নেতাকর্মীদের সঙ্গে খুব কমই কথা বলছেন। বিদেশে দলের যেসব নেতাকর্মী রয়েছেন তাদের সঙ্গে কম-বেশি যোগাযোগ করে নানা নির্দেশনা দিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তাদের দলীয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, এমপি-সাবেক এমপি ও দলীয় নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে চলে গেছেন। অনেকে দেশ ছেড়েছেন। আবার অনেকেই দেশে থেকেও প্রকাশ্যে আসছেন না। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়েছেন এসব নেতাকর্মীরা। মণিরামপুরে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আওয়ামী নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা বেড়েছে এবং নিজেদের অবস্থান জানাতে মণিরামপুর আওয়ামী লীগের উপজেলা কার্যালয়ে দলীয় পোস্টার লাগাতেও দেখা গেছে এবং রাজগন্জ ডিগ্রী কলেজের ছাত্রলীগের কর্মীদের জয় বাংলা স্লোগান দিতে দেখা গেছে। এসমস্ত ঘটনা একাধিক ফেসবুক আইডি থেকে শেয়ার ও পোস্ট করা হয়েছে। আর মন্তব্যের ঝড় উঠেছে নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মণিরামপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রমেশ দেবনাথের পোস্টে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী আওয়ামী নেতা স্বপন ভট্টাচার্য, তার ভাগ্নে যুবলীগের মণিরামপুর উপজেলা শাখার আহবায়ক ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান উত্তম চক্রবর্তী বাচ্চুদের রাজনৈতিক সিন্ডিকেট সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছুটা নিরব হলেও ৫ই আগস্টের পর থেকেই প্রকাশ্যে রয়েছেন তাদের একান্ত অনুসারী দ্বিতীয় প্রতিমন্ত্রী আখ্যায়িত মণিরামপুর বাজার বণিক সমিতি এবং উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতিসহ একাধিক মন্দির ও মহাশ্মশানের দায়িত্ব থেকে শুধু নিজের উন্নয়নের কারিগর তুলসী বসু সহ একাধিক ক্লিং ইমেজের বেশ কিছু নেতাকর্মীরা। অর্থ আর স্বার্থ যেন রাজনীতির একটা নৈমিত্তিক ব্যাপার।

আলোচনার শীর্ষে প্রায় সময়ই থাকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সিআইপি (এনআরবি), আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ও ৫ই আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত সংসদ সদস্য এসএম ইয়াকুব আলী ও তার অনুসারীরা। ইয়াকুব আলীর একাধিক অনুসারীরা নিয়মিত তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বিশেষ দিনে শুভেচ্ছা/শোকবার্তা জানালেও লিখেছেন না আওয়ামী লীগের পদবী, শুধুই লিখছেন সাবেক সংসদ সদস্য। ইতিমধ্যে তিনি তার অনুসারীদের গোপনে অর্থনৈতিক সুবিধাও দিচ্ছেন বলে দেখা গিয়েছে। সবথেকে আশ্চর্যজনক জনক ব্যাপার ইয়াকুব আলীর অর্থের বিনিময়ে স্থানীয় কিছু সুপরিচিত ফেসবুক পেজেও বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন, এতে করে অবশ্যই ফেসবুক পেজ এডমিনের সাথে তার যোগাযোগ ও বিজ্ঞাপন কেন্দ্রিক লেনদেন হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছেন মুলধারার সাংবাদিকেরা।
যেহেতু আওয়ামী লীগের কোন নেতা এখনও পর্যন্ত কোন প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে পারেনি বা কতৃপক্ষ নেয়নি সেহেতু এই স্থানীয় সম্পূর্ণ অবৈধ ফেসবুক পেজ ও এডমিনদের আওয়ামীপন্থী মনোভাবই এর মুল কারণ। যশোরের নিয়মিত প্রিন্ট পত্রিকায় বিশেষ দিনের বিজ্ঞাপন প্রদানকারী আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের ভরসা এখন ওয়েবসাইট ব্যতিত তথ্যমন্ত্রণালয়ের পরিপন্থী সম্পূর্ণ অবৈধ ফেসবুক পেজ।
মণিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ অধ্যক্ষ কাজী মাহামুদুল হাসান ও প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক মোঃ ফারুক হোসেনের সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন কার্যক্রম না পাওয়া গেলেও থেমে নেই মণিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের আরেক প্রভাবশালী নেতা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন লাভলু ও তার অনুসারীরা। আমজাদ হোসেন লাভলু নিজে এবং তার পরিবার ও তার অনুসারীদের ফেসবুক আইডি থেকেও চলছে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা ও রাজনৈতিক বিভিন্ন পর্যালোচনা।
পলাতক থেকেও ক্লিন ইমেজের মধ্যে থেকে সরব রয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রীর একনিষ্ঠ সহচর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা এ্যাড: বশির আহমেদ, ৫ই আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও ছাত্রলীগ থেকে উঠে আসা আওয়ামী লীগ নেতা সন্দীপ ঘোষ, যশোর-৫ মণিরামপুর আসন থেকে বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য দেশের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব মরহুম এ্যাড: খান টিপু সুলতানের ছেলে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হুমায়ুন সুলতান সাদাব, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য সহ বেশ কিছু হেভিওয়েট নেতাদের।
প্রকাশ্যে থেকে আইনগত সহায়তা প্রদানের দৃশ্য দেখা গিয়েছে উপজেলার দূর্বাডাঙ্গা ইউনিয়নের সন্তান যশোর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি এ্যাড: আলমগীর হোসেনকে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের আটক হওয়া একাধিক নেতাদের আইনগত সহায়তা দিচ্ছেন তিনি। যার চিত্র নিজের ফেসবুক আইডিতে তিনি নিয়মিত পোস্ট করছেন।
উপজেলা পর্যায়ে মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রীদের মধ্যে সরব রয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নাজমা খানম, সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান কাজী জলি আক্তার। প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছে মহিলা লীগ নেত্রী সুরাইয়া আক্তার ডেইজি ও মাজেদা বেগমসহ বেশ কিছু নেত্রীদের। পৌর কাউন্সিলর, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ মার্কামারা অধিকাংশ আওয়ামী লীগের নেতারা পলাতক হলেও নিজ নিজ ফেসবুক আইডি থেকে নিয়মিত দলীয় স্ট্যাটাস দিতে দেখা গেছে বেশ কয়েকজনকে। দুঃখজনক হলেও সত্যি ‘বর্তমানে ক্ষমতায় না থেকেও চলছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের গ্রুপিংয়ের রাজনীতি।

উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম সাইবার স্পেসসহ যেকোনো মাধ্যমে নিষিদ্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দল ও এর নেতাদের বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির পক্ষে যেকোনো ধরনের প্রচারণা বা সংবাদ প্রকাশ আইনত নিষিদ্ধ।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিভিন্ন বৈশ্বিক সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে দলের কর্মী ও সমর্থকরা নানা ধরনের মতাদর্শ ও প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা নিয়ে নানা বিতর্ক ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনা রয়েছে।

অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আওয়ামী লীগ সংক্রান্ত বিভিন্ন খবর এবং ভুয়া তথ্য (মিস-ইনফরমেশন) প্রতিরোধে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর সতর্কতা ও নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেশের অভ্যন্তরে পলাতক থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চিহ্নিত করে আটক করাও হচ্ছে।
যেহেতু প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় দলটির অফিসিয়াল বা অনানুষ্ঠানিক কার্যক্রম শেয়ার করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সারাদেশের ন্যায় যশোর জেলার মণিরামপুর উপজেলার অধিকাংশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে থেকে হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন এবং স্থানীয় নির্বাচনে এরা প্রভাব বিস্তার করতে পারেন বলেও মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ইতিমধ্যে তথ্য এসেছে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাদের বর্তমান রাজনৈতিক মহলের সাথে আতাতের নানান ঘটনা। আগামীতে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।