লোকসমাচার,নিজস্ব প্রতিবেদক:বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে ক্যান্সারকে ভয় না পেয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই এ রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় বা দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক ডা. আসমা সিদ্দিকা।
তিনি বর্তমানে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল-এর রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের ক্যান্সার পরিস্থিতি, চিকিৎসা ব্যবস্থা, প্রতিরোধ ও সচেতনতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
অধ্যাপক ডা. আসমা সিদ্দিকা বলেন, বর্তমানে ক্যান্সার রোগী বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধার প্রসার এবং পরিবেশ দূষণ, খাদ্যে ভেজাল, তামাকের ব্যবহার ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে বাস্তবিক অর্থেই ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়েছে।
তিনি বলেন, ক্যান্সার প্রতিরোধে স্ক্রিনিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে স্তন ক্যান্সার ও জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব, যা চিকিৎসার সফলতার হার অনেক বাড়িয়ে দেয়।
জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এইচপিভি ভ্যাকসিন গ্রহণ অত্যন্ত কার্যকর। সময়মতো ভ্যাকসিন গ্রহণ করলে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে বর্তমানে স্তন ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি দেখা যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাস, দেরিতে সন্তান গ্রহণ এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে এ রোগের প্রকোপ বাড়ছে। তাই নারীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোন থেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপিসহ প্রায় সব ধরনের আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা বিদ্যমান। ফলে বিদেশে না গিয়েও দেশের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসা গ্রহণ সম্ভব।
দেশের ওষুধ শিল্পের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশেই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অনেক ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদিত হচ্ছে, যা দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।দেশে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনকোলজি বিষয়ে তরুণ চিকিৎসকদের আগ্রহ বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে এ খাতে আরও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রোগীর অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীরা এখানে চিকিৎসার জন্য আসেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ক্যান্সার চিকিৎসা সেবার বিকেন্দ্রীকরণ অত্যন্ত জরুরি।
তিনি জানান, সরকারি হাসপাতালে বর্তমানে অনেক রোগীকে বিনামূল্যে কেমোথেরাপি প্রদান করা হচ্ছে এবং স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সর্বশেষে দেশের মানুষের প্রতি বার্তা দিয়ে অধ্যাপক ডা. আসমা সিদ্দিকা বলেন, “ক্যান্সারকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তবে অবহেলা করারও সুযোগ নেই। সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণই ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। শরীরে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।”তিনি আশা প্রকাশ করেন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আরও সফলতা অর্জন করবে।























