নিজস্ব প্রতিবেদক:জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে নিরাপদ পানির সংকট ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। এ সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ ও পানি বিশেষজ্ঞরা।বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ নিরাপদ পানি আন্দোলন (বানিপা) আয়োজিত “জলবায়ু সংকট ও নিরাপদ পানির চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশের করণীয় ও টেকসই সমাধান” শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বানিপার সভাপতি প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন। সঞ্চালনা করেন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)-এর যুগ্ম সম্পাদক এম. এ. ওয়াহেদ। প্রধান অতিথি ছিলেন পবার চেয়ারম্যান আবু নাসের খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মুঈদ।
প্রধান অতিথি আবু নাসের খান বলেন, শিল্পকারখানার বর্জ্যের কারণে দেশের নদী ও জলাশয় মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। তিনি কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে পানির অপচয় কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মূল প্রবন্ধে ড. মো. আব্দুল মুঈদ জানান, WHO ও UNICEF-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে এখনও প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ পানীয় জলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এছাড়া ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা এবং ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার সুযোগ পান না।তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের এমআইসিএস (MICS) জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে মাত্র ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত পানীয় জলের আওতায় রয়েছে। আর্সেনিক দূষণ, জীবাণুযুক্ত সংরক্ষিত পানি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা দেশের নিরাপদ পানির সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশেষ অতিথি অধ্যাপক ডা. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা এখন শুধু পরিবেশগত নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা মোকাবিলায় উপযোগী প্রযুক্তি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং বিকল্প পানির উৎস গড়ে তোলার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. প্রকৌশলী মো. আবুল কাসেম নদী, ভূগর্ভস্থ পানি ও জলাভূমির সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ড. মো. নাইম হোসেন জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় গ্রিন বিল্ডিং ও জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য পানিবণ্টন নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
সেমিনারে বক্তারা নদী, ভূগর্ভস্থ পানি ও জলাভূমির সমন্বিত ব্যবস্থাপনা জোরদার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ সম্প্রসারণ, শিল্পবর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য শোধন বাধ্যতামূলক করা, নদী দূষণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, জলবায়ু সহনশীল পানি অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের সুপারিশ করেন।
বক্তারা বলেন, নিরাপদ পানি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। সমন্বিত পরিকল্পনা, কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই একটি নিরাপদ, সুস্থ ও জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।



















